মোঃ মাইন উদ্দিন :
পূর্বপরিকল্পিত হামলা, প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, আর নীরব দাঁড়িয়ে থাকা সমাজ- এটাই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? কিশোর গ্যাংয়ের উন্মত্ততা, নৈতিক অবক্ষয় আর সামাজিক উদাসীনতার কাছে কি আমরা সবাই আজ পরাজিত? আর কত মায়ের বুক খালি হলে, আর কত বাবার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হলে আমরা বলব- “এবার যথেষ্ট”?
কিশোর গ্যাং আজ শুধু একটি অপরাধী চক্রের নাম নয়- এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও মূল্যবোধের ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী শিখছে- এসব প্রশ্ন থেকে পরিবার সরে দাঁড়িয়েছে। সমাজও যেন দায়িত্ব ভুলে গেছে। সেই অবহেলারই ভয়ংকর মূল্য দিতে হচ্ছে নিরপরাধ মানুষকে।
সর্বশেষ সেই নির্মম মূল্য দিল কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামের ২০ বছর বয়সী তরুণ জুয়েল মিয়া।
জুয়েল মিয়া শুক্রবার (১০ জুলাই) বিকেলে বন্ধুর ডিমবাহী গাড়িতে করে আগরপুর বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল। তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কাঁধে ছিল পরিবারের দায়িত্ব। সে পেশায় গাড়িচালক। এই তরুণ আজও প্রতিদিনের মতোই জীবিকার সন্ধানে বের হয়েছিল। কিন্তু সে জানত না, পথের মাঝেই ওত পেতে আছে মৃত্যু।
কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের পশ্চিমে পশ্চিম আব্দুল্লাহপুর যাওয়ার মোড়ে গাড়ি থামিয়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে নামানো হয়। কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি, কোনো অপরাধ প্রমাণের প্রয়োজনও মনে করেনি হামলাকারীরা। প্রকাশ্য রাস্তায় চলে পাশবিক মারধর। এ সময় রক্তাক্ত জুয়েল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। স্থানীয়রা থাকে উদ্ধার করে রওনা দেয় হাসপাতালের পথে, কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় মাত্র ২০ বছর বয়সী তরুণ জুয়েলের প্রাণ প্রদীপ।
আরও মর্মান্তিক সত্য হলো, জুয়েল ওই বিরোধের কেউ ছিল না। স্থানীয়দের দাবি, কাবাডি খেলা নিয়ে দুই এলাকার যুবকদের বিরোধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবুও তাকে মরতে হলো। শুধুমাত্র ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকার অপরাধে!
একবার ভাবুন, যে ছেলে সকালবেলা পরিবারের জন্য রুটি-রুজির চিন্তায় ঘর থেকে বের হয়েছিল সেই ছেলে সন্ধ্যার আগেই সে ফিরে এলো নিথর লাশ হয়ে। একজন বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ- এর চেয়ে নির্মম দৃশ্য আর কী হতে পারে? একটি পরিবারের হাসি, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ, সবকিছু মুহূর্তেই রক্তে ভেসে গেল।
পুলিশ বলছে, হত্যাকারীদের শনাক্তে অভিযান চলছে। হ্যাঁ, আমরাও জানি মামলা হবে, গ্রেপ্তার হবে, কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর কে দেবে- জুয়েলকে কি আর ফিরিয়ে আনা যাবে? তার মায়ের বুকের হাহাকার, বাবার অসহায় কান্না, ভাইবোনের শূন্যতা- এসবের বিচার কীভাবে হবে?
আজ কিশোর গ্যাং শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ংকর অশনিসংকেত। খেলার মাঠ, স্কুল, রাস্তা, কোথাও যদি একজন তরুণ নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি?
প্রশ্ন একটাই- আর কত জুয়েলের প্রাণ ঝরলে আমরা জাগব? আর কত নিরপরাধ তরুণের লাশ দেখলে পরিবার, সমাজ, প্রশাসন এবং আমাদের বিবেক একসঙ্গে জবাবদিহি করবে?
জুয়েলের মৃত্যু কোনো এক পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সবার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তবে আগামীকাল হয়তো আরেকটি জুয়েল, আরেকটি পরিবার, আরেকটি স্বপ্ন একইভাবে রক্তাক্ত হবে।
তাই এখনই সময় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। পরিবারকে দায়িত্ব নিতে হবে, সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে, আইনকে হতে হবে দ্রুত ও কঠোর। কারণ, একটি সভ্য সমাজে কাবাডির মাঠের তুচ্ছ ঘটনায় কেউ কবরের পথে পরিণত হতে পারে না।