মোঃ মাইন উদ্দিন :
কাউকে হত্যা করতে কখনো কখনো অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না, ভেতর থেকে মানবিকতাটুকু চলে গেলেই যথেষ্ট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে মোঃ ফয়সাল (২৬) নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা সেই নির্মমতাই সামনে এলো। চোর সন্দেহে তাকে প্রথমে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন এবং পরে পিঠের ওপর একের পর এক ভারী ইট চাপিয়ে দিয়ে হত্যা! একজন মানুষকে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া শুধু একটি পরিবারের বুক খালি করে দেওয়া নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ছে- আমরা আসলে কোন সমাজে বাস করছি?
চুরির অভিযোগ ছিল- এটি তদন্তের বিষয়। অভিযোগ সত্য ছিল কি না, সেটিও তদন্তেই প্রমাণিত হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে একজন মানুষকে ধরে এনে নির্যাতন করার অধিকার কারও নেই। তার চেয়েও বড় কথা, কাউকে হত্যা করার অধিকার তো একেবারেই নেই। মানুষ অপরাধ করতে পারে, কিন্তু অপরাধের বিচার করার ক্ষমতা ব্যক্তির হাতে তুলে দিলে রাষ্ট্রের আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থার অস্তিত্বই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে স্থানীয় ইউপি সদস্য আলী আকবর নিহত ফয়সালকে পেশাদার চোর দাবি করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে আগেও চুরির অভিযোগ থাকার কথা বলেছেন। অন্যদিকে ফয়সালের বাবা বাদশাহ মিয়া দাবি করেছেন, তার ছেলে সাধারণ দিনমজুর ছিলেন। কে সত্য বলছেন, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে যে নির্মম সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট- অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে নির্যাতন করে হত্যা করার অনুমতি কোনো আইন দেয় না।
একবার ভাবুন, একজন বাবা তার ছেলেকে নিয়ে কি স্বপ্ন দেখেছিলেন! হয়তো দিনশেষে ঘরে ফিরবে ছেলে, সামান্য আয় হাতে তুলে দেবে, পরিবারের মুখে খাবার জুটাবে। সেই ছেলেই যদি কোনো অভিযোগে মানুষের হাতে ধরা পড়ে আর পরিবারের কাছে ফিরে আসে নিথর দেহ হয়ে- তাহলে সেই পরিবারের কাছে রাষ্ট্রের আইন কি অর্থ বহন করবে? একজন মায়ের কাছে তার সন্তান চোর ছিল কি না, সেটি হয়তো পরের প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন- তার সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টা কি কেউ করেছিল?
আরও কষ্টের বিষয়, নির্যাতনের ভিডিও’র দৃশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদে এসেছে। আমরা কত দ্রুত মোবাইল ফোন বের করে ক্যামেরা চালু করতে পারি! কিন্তু একজন বিপদে পড়া মানুষকে বাঁচাতে সেই হাত কি এত দুর এগিয়ে আসে? একজন মানুষ যখন অসহায়, তখন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করা আর তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা- এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য শুধু প্রযুক্তির নয়, মানবিকতারও।
মব-সন্ত্রাস বলতে আমরা প্রায়ই বড় একটি জনতার হামলাকে বুঝি। কিন্তু কয়েকজন মানুষ মিলে একজনকে ধরে নির্যাতন করলেও মূল সমস্যাটি বদলায় না। ভিড় ছোট হলেই অন্যায় ছোট হয়ে যায় না। পাঁচজন মিলে অন্যায় করলে সেটি অন্যায়, পঞ্চাশজন মিলে করলেও অন্যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।
ফয়সাল সত্যিই চুরি করতে গিয়েছিলেন কি না, তার বিরুদ্ধে আগের কোনো মামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল কি না- এসব তথ্য অবশ্যই তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু তিনি অপরাধী হলেও তার বিচার করার অধিকার ছিল রাষ্ট্রের। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারত, তদন্ত হতে পারত, আদালতে বিচার হতে পারত, প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে পারত। অথচ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যদি মানুষের হাতে শাস্তি কার্যকর হয়ে যায়, তাহলে কাল একই অভিযোগে আরেকজন নিরপরাধ মানুষও কি নিরাপদ থাকবে?
আজ ফয়সাল। আগামীকাল হয়তো অন্য কোনো নাম। কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ উঠতে পারে। যদি অভিযোগই অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায়, যদি সন্দেহই শাস্তির কারণ হয়ে যায়, তাহলে আদালতের প্রয়োজন কোথায়? তদন্তের প্রয়োজন কোথায়? পুলিশের প্রয়োজনই বা কোথায়?
আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো- রাষ্ট্র কাউকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী ঘোষণা করে না। প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হয়। এই নীতিটি অপরাধীর সুবিধারের জন্য শুধু নয়, নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্যও।
তাই মহেশখালীর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করতে হবে। কারা নির্যাতনে সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা সহযোগিতা করেছে, কারা দাঁড়িয়ে থেকে এই দৃশ্য উপভোগ করেছে এবং ঘটনার আগে-পরে কার কি ভূমিকা ছিল- তদন্তে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তবে তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না- যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের সত্যতা দিয়ে তার মৃত্যুকে বৈধতা দেওয়া যায় না। অপরাধের অভিযোগের বিচার আলাদা বিষয়, মানুষের জীবন রক্ষা করা আলাদা দায়িত্ব। এই দুটিকে এক করে ফেললে ন্যায়বিচার নয়, প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমরা এমন সমাজ চাই না, যেখানে পুলিশ আসার আগেই মানুষের হাতে বিচার শেষ হয়ে যায়। এমন একটি রাষ্ট্রও চাই না, যেখানে একজন মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে তাকে ঘিরে ভিডিও ধারণ করা সহজ হয়ে যায়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অপরাধী থাকলে সে আইনের আওতায় যাবে, নিরপরাধ হলে সে আইনের সুরক্ষা পাবে এবং কোনো মানুষকে সন্দেহের বশে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হবে না।
ফয়সালের মৃত্যু আমাদের সামনে শুধু একটি প্রশ্ন রেখে যায় না- তিনি চোর ছিলেন কি না। আরও বড় প্রশ্ন রেখে যায়- অভিযোগের বিচার কি খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতন, পিঠে ইটের ভার দিয়ে হত্যা, নাকি আইনী আদালতে?
একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষের বিচার হয় আইনের মাধ্যমে, ইটের ভারে নয়। অপরাধীর বিচার অবশ্যই চাই, কিন্তু বিচারের নামে আরেকটি অপরাধ চাই না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। প্রমাণ থাকলে আদালতে উপস্থাপন করুন। বিচার চাইলে আইনের পথেই হাঁটুন।
কারণ একজন অপরাধীরও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে, আর একজন নিরপরাধ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার তার চেয়েও মৌলিক। আজ ফয়সালকে পিঠের ওপর ইটের ভার চাপিয়ে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে; কাল যেন আমাদের সমাজের বিবেকের ওপর সেই ইট না চাপানো হয়।