যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম দীর্ঘ দিন ধরে গণমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছে। সংবাদ সংগ্রহ, ডেটা বিশ্লেষণ, তথ্য যাচাই থেকে শুরু করে পাঠকের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস পরিবর্তনে এআই কীভাবে ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি কিংবা গুগলের জেমিনির মতো চ্যাটবটগুলো মানুষের সংবাদ পাওয়ার অন্যতম নতুন মাধ্যম হয়ে উঠছে। এর ফলে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের মূল ওয়েবসাইটে পাঠকের যাতায়াত এবং সম্পৃক্ততার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও নানা উপায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের নিউজরুমগুলোতে ছবি তৈরি, তথ্য সংক্ষেপ করা, বানান ও বাক্য সংশোধন, ডেটা বিশ্লেষণ এবং অনুবাদের কাজে নিয়মিত এআই টুল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ত্রুটি থাকলেও নিউজরুমের কর্মীদের মানবিক সম্পাদনা যুক্ত হওয়ায় সংবাদ পরিবেশনে ধীরে ধীরে উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিশাল পরিমাণ নথি বা ডেটা দ্রুত বিশ্লেෂণ করতে এআই অত্যন্ত কার্যকরী সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
তবে গণমাধ্যমে এআই ব্যবহারের ফলে অপতথ্য ও ভুয়া খবর বা মিসইনফরমেশন ছড়ানোর ঝুঁকিও মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ছবি, ভিডিও, ফটোকার্ড কিংবা নকল কলরেকর্ড অনেক সময় সংবাদমাধ্যমগুলোকেও বিভ্রান্ত করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গণমাধ্যমগুলো নিজস্ব ফ্যাক্টচেকিং টিম গঠনের চেষ্টা চালালেও চ্যালেঞ্জ দিন দিন জটিল হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ব্রাজিল ও স্পেনের মতো দেশের বিশেষজ্ঞরা ভুয়া তথ্য রোধে এআইনির্ভর রিয়েল-টাইম ফ্যাক্টচেকিং টুল ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেবল সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে সংবাদ ব্যবসার সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে সরাসরি চ্যাটবট থেকে পাঠকের সংবাদ প্রাপ্তির প্রবণতা। পাঠক যদি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট বা সার্চ ইঞ্জিনে না গিয়ে সরাসরি চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হয়, তবে সংবাদপোর্টালগুলোর ভিজিটর কমে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এই কপিরাইট ও কনটেন্ট চুরির অভিযোগে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অনেক সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়েও জড়িয়ে পড়েছে। আবার অন্যদিকে, ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো কিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক চুক্তিও করেছে। ফলে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর ভবিষ্যৎ পথচলায় বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক মডেলগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।