বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫০ অপরাহ্ন
Title :
হংকংয়ে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও পরিবারের সম্পদ জব্দের নির্দেশ স্পেনে আরও একটি ক্লাব কিনতে যাচ্ছেন মেসি পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের বাবা ডাক শোনার আগেই পৃথিবী ছাড়লেন সেনাসদস্য ছিদ্দিক পুলিশের হাতে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শতবর্ষী নূর মোহাম্মদের পুরনো গল্প পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা নিয়ে উধাও কর্মচারী, বিপাকে ৯১ শিক্ষার্থী এসএসসিতে মাত্র এক বিষয়ে পাস করা শিক্ষার্থীর জিপিএ ৪.৯৪, তদন্তে কমিটি নওগাঁয় আদালতে হাজিরা দেওয়ার সুযোগে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট এআই যেভাবে বদলে দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, মাদরাসা শিক্ষককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ

পুলিশের হাতে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শতবর্ষী নূর মোহাম্মদের পুরনো গল্প

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৮ Time View
11

মোঃ মাইন উদ্দিন :
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধকে হ্যান্ডকাপ পড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ- সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একটি ভিডিও হয়তো অনেকের চোখেই পড়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ শতাব্দীর পুরনো এক গল্প। যে গল্পে আছে খুন, ডাকাতি, লুট, পলাতক জীবন, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং শেষ পর্যন্ত আইনের কাছে আত্মসমর্পণের নির্মম পরিণতি।
গল্পের সূত্রপাত হয় ২০০০ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজারে একটি স্বর্ণ ও সিন্দুকের দোকানে ঘটে যায় দুঃসাহসিক ডাকাতি। ডাকাতদের হামলায় প্রাণ হারান মোশাররফ হোসেন ও আব্দুল কবির নামের দুজন। লুট হয় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা এবং ১১০ ভরি স্বর্ণ। ওই মামলার অভিযুক্তদের একজন ছিলেন নূর মোহাম্মদ। তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করলে তিনি ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। তারপরও জামিনে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান। এরপর কেটে যায় বছরের পর বছর। এদিকে তার অনুপস্থিতিতেই চলতে থাকে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া।
অবশেষে ২০০৩ সালে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল নূর মোহাম্মদসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও আপিলের পর ২০০৭ সালে উচ্চ আদালত তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করেন। কিন্তু রায় হলেও নূর মোহাম্মদ ছিলেন পলাতক। সময় গড়িয়েছে, বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে সমাজের অনেক কিছু, কিন্তু তার বিরুদ্ধে থাকা সেই মামলার আইনি দায় মুছে যায়নি। অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের আত্মগোপনের অবসান ঘটিয়ে নূর মোহাম্মদ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আর সেই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই শেষ হয় দীর্ঘদিনের পলাতক জীবনের অধ্যায়।
কিন্তু আদালতের সামনে যিনি দাঁড়ালেন, তিনি আর সেই তরুণ নূর মোহাম্মদ নন। তিনি ১০৪ বছরের এক বৃদ্ধ। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, স্বাভাবিকভাবে হাঁটার শক্তিও প্রায় নিঃশেষ। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শরীরজুড়ে নানা জটিলতা, নির্ভরতা ও দুর্বলতা। আদালতে তার আইনজীবী হয়তো শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় জামিনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আদালত আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ফলে যে মানুষটি একদিন আইনকে এড়িয়ে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে ছিলেন, জীবনের শেষ বিকেলে তাকেই আইনের সামনে দাঁড়িয়ে তার অতীতের হিসাবের মুখোমুখি হতে হলো।
নূর মোহাম্মদের এই পরিণতি নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। ১০৪ বছরের এক জীর্ণ বৃদ্ধের হাতে হ্যান্ডকাপের দৃশ্য মানবিক অনুভূতিকে নাড়া দেয়। চোখের সামনে তখন একদিকে ভেসে ওঠে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া একজন অসহায় মানুষ, অন্যদিকে মনে পড়ে যায় দুই যুগ আগে নিহত দুই ব্যক্তির পরিবার, তাদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। আইন ব্যক্তির বয়স, অবস্থান কিংবা সময়ের ব্যবধান দেখে তার প্রয়োগ বন্ধ করতে পারে না- এটাই আইনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আইনের শাসনের সঙ্গে মানবিকতাকেও বিবেচনায় রাখার প্রয়োজনীয়তা কখনো শেষ হয় না।
সময় অনেক কিছু মুছে দেয়, কিন্তু অপরাধের আইনি দায় সবসময় মুছে দেয় না। সময়ের ধুলোয় পুরনো হয়ে যেতে পারে একটি মামলা, মানুষের স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে, বদলে যেতে পারে অপরাধীর চেহারা ও জীবন- কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি থেকে যায়। নূর মোহাম্মদের জীবনের এই শেষ অধ্যায় তাই শুধু একজন বৃদ্ধের কারাগারে যাওয়ার গল্প নয়- এটি সময়, আইন, অপরাধ, বিচার এবং মানবিকতার এক কঠিন বাস্তব পাঠ। জীবনের শেষ বিকেলেও অতীতের হিসাবের মুখোমুখি হতে হয়- নূর মোহাম্মদের হ্যান্ডকাপ পরা হাত যেন সেই কঠিন সত্যেরই এক নীরব প্রতীক।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com