শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৭ অপরাহ্ন
Title :
চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতারের পর যুবদল নেতা বহিষ্কার সাভারে মাদরাসাছাত্রকে বলাৎকার, গ্রেফতার ৫ বদলির তদবির করলে ব্যবস্থা, ভূমি কর্মকর্তাদের সতর্ক করলো মন্ত্রণালয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো যাবে কোথায়? জাতিসংঘের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই সুন্দরগঞ্জে তিস্তার ভয়াবহ ভাঙন: ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করলেন এমপি ও ইউএনও সৈয়দপুরে আঞ্জুমানে গাউসিয়ার উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু ক্যাম্প, চিকিৎসাসেবা পেলেন দুই শতাধিক রোগী রামগঞ্জে অভিনব উদ্যোগ: মসজিদ ছুঁয়ে মাদক ছেড়ে দেওয়ার শপথ নিলেন গ্রামবাসী রাষ্ট্রপতির অপেক্ষায় ঠাকুরগাঁও

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো যাবে কোথায়?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৯ Time View
21

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো যাবে কোথায়?

মোঃ মাইন উদ্দিন :
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে আমরা দেখি, কিন্তু তার জীবনটা দেখি না। আমরা দেখি তার হাততালি, উচ্চকণ্ঠের কথা, পথচারীর সামনে এগিয়ে যাওয়া কিংবা বাস-ট্রেনে টাকা চাওয়া। আমরা এসব দেখে বিরক্ত হই, কখনো হাসাহাসি করি, কখনো পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে যাই। কেউ কেউ বিরক্ত কণ্ঠে বলেন, এদের অত্যাচারে রাস্তায় চলাই দায়! কেউ আবার গায়ে হাতও তুলে বসে- কিন্তু খুব কম মানুষই থেমে প্রশ্ন করি- আসলে এই মানুষগুলো যাবে কোথায়? কোথায় তাদের নিরাপদ আশ্রয়, কোথায় সেই স্কুল যেখানে তাদের দেখে কেউ হাসবে না, কোথায় সেই কর্মক্ষেত্র যেখানে পরিচয়ের কারণে চাকরি হারাতে হবে না, আর কোথায় সেই সমাজ যেখানে মানুষ হওয়ার জন্য নারী কিংবা পুরুষের নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ঢালতে হবে না?
তৃতীয় লিঙ্গের শিশুও জন্ম নেয় অন্য সব শিশুর মতোই। তারও দুটি চোখ আছে স্বপ্ন দেখার জন্য, দুটি হাত আছে পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখার জন্য, একটি হৃদয় আছে ভালোবাসা পাওয়ার জন্য এবং অপমান পেলে কষ্ট পাওয়ার জন্য। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কথা বলা, হাঁটা, চলাফেরা কিংবা নিজেকে প্রকাশ করার ধরন অন্যদের চোখে ভিন্ন মনে হলেই শুরু হয় এক অদৃশ্য বিচারসভা। স্কুলে কেউ তাকে দেখে হাসে, কেউ কটাক্ষ করে ডাকে, কেউ তার চলাফেরা নকল করে, কেউ বিদ্রূপ করে। চারপাশের মানুষও অনেক সময় শুধু নীরব দর্শক হয়ে থাকে। একসময় শিশুটি বুঝে যায় এই পৃথিবীতে সবার মতো হওয়ার অধিকার যেন সবার জন্য সমান নয়। স্কুল তখন আর তার জন্য শিক্ষার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে অপমানের ভয়। বইয়ের পাতার চেয়ে মানুষের মুখের কথাগুলো বেশি ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। একটা সময় তারা পড়াশোনার পথ থেকেই ছিটকে পড়ে। তারপর সমাজ বলে, ওরা তো লেখাপড়া করে না। অথচ আমরা খুব কমই প্রশ্ন করি- তারা কেন পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি?
স্কুলের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষটি ফিরে আসে ঘরে। কিন্তু ঘর কি সবসময় আশ্রয় স্থল? দুঃখের বিষয়, তাদের জন্য নিজের ঘরও একসময় পর হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা হয়তো ভালোবাসেন, কিন্তু লোকসমাজের ভয়, আত্মীয়স্বজনের কটূক্তি কিংবা সামাজিক লজ্জার কারণে সেই ভালোবাসার প্রকাশ থেমে যায়। একই ছাদের নিচে থেকেও একজন মানুষ তখন একা হয়ে যায়। খাওয়ার টেবিলে সে আছে, কিন্তু আলোচনায় নেই। পরিবারের সদস্য সে, কিন্তু ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় নেই। নিজের বাড়িতে থেকেও যখন একজন মানুষ নিজেকে অতিথি মনে করে, এরচেয়ে বড় নির্বাসন আর কি হতে পারে!
তারপরও কেউ কেউ সাহস করে বাইরে বের হয়, চাকরি খোঁজে, কোনো কারখানায় যায়, দোকানে কাজ চাইতে যায় কিংবা অফিসের দরজায় দাঁড়ায়। কিন্তু অনেক সময় তার দক্ষতার আগে বিচার হয়ে যায় তার পরিচয়। কয়েকদিন কাজ করার পর হয়তো তাকে বলা হয়, আপনাকে নিয়ে অন্যরা অস্বস্তিতে আছে। কখনো কোনো স্পষ্ট কারণও দেওয়া হয় না, শুধু বুঝিয়ে দেওয়া হয়- এই জায়গাটা আপনার জন্য নয়। সে যদি জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা বা অন্য কোনো কাজ করতে চায়, সেখানেও তাকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে দেওয়া হয় না। কিছু মানুষ তাকে মানুষ হিসেবে নয়, বিনোদনের বস্তু হিসেবে দেখে, বিদ্রূপ করে, উত্যক্ত করে, অশোভন আচরণ করে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি দরজায় যেন লেখা- আপনার প্রবেশ নিষেধ।
তারপর একদিন সেই মানুষটিকে আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। হাত বাড়িয়ে টাকা চাইতে দেখি। অনেক সময় বিরক্তিকর আচরণ করতেও দেখি। আর তখন ক্ষুব্ধ হয়ে বলি- এরা এমন কেন? কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো ভেবেছি- এদের এমন হয়ে ওঠার পেছনে আমাদের সমাজের কোনো দায় আছে কি না? একজন মানুষকে যদি বারবার বলা হয়, তুমি আমাদের মতো নও, যদি তাকে স্কুলে উপহাস করা হয়, কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, পরিবারে অস্বস্তির কারণ ভাবা হয়, সমাজে চলাফেরা করলেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়- তাহলে সে কোথায় দাঁড়াবে? কোন পথে হাঁটবে? কোন দরজায় গিয়ে বলবে- আমাকেও একটু মানুষ হিসেবে বাঁচতে দিন।
তবে এখানেই সব দায় শুধু সমাজের ওপর চাপিয়ে দিয়ে থেমে গেলে চলবে না। তৃতীয় লিঙ্গের কিছু মানুষের আচরণ নিয়েও সাধারণ মানুষের অভিযোগ রয়েছে- এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জোর করে টাকা আদায়, মানুষকে বিব্রত করা কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অশোভন আচরণ অবশ্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অধিকার যেমন সবার আছে, তেমনি দায়িত্বও সবার। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও বুঝতে হবে, সম্মান আদায়ের পথ কখনো অন্যকে অসম্মান করে তৈরি হয় না। নিজেদের শিক্ষা, দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক আচরণের মধ্য দিয়েই তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। কিন্তু আমাদের দায় কি শুধু উপদেশ দেওয়া? আমরা কি তাদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছি? কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দিয়েছি? আমাদের অফিস, দোকান কিংবা কারখানায় যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দিয়েছি? নাকি শুধু বলেছি- ওদের থেকে দূরে থাকো?
আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত এখানেই- আমরা মানুষকে আগে পরিচয়ে ভাগ করি, পরে তার মানবিকতার বিচার করি। কেউ পুরুষ, কেউ নারী, আর কেউ প্রচলিত এই বিভাজনের বাইরে দাঁড়ালেই তাকে আমরা অন্য বানিয়ে ফেলি। অথচ মানুষ কি শুধু একটি পরিচয়? তার কি স্বপ্ন নেই, ক্ষুধা নেই, কষ্ট নেই, ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই? একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও হয়তো রাতে ঘুমানোর আগে ভাবেন- আগামীকাল কি খাবেন। হয়তো তিনিও চান একটি সম্মানজনক চাকরি করতে, নিজের উপার্জনের টাকায় পরিবারের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যেতে। হয়তো তিনিও চান, রাস্তায় হাঁটার সময় কেউ তাকে দেখে হাসবে না, আঙুল তুলে দেখাবে না, মানুষ ছাড়া অন্য কিছু ভাববে না।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের করুণা নয়, প্রয়োজন সুযোগ, দয়া নয়, প্রয়োজন মর্যাদা। তাদের সমাজের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে স্বাভাবিক হওয়ার উপদেশ দিলে হবে না, আগে সমাজের দরজাগুলো খুলতে হবে। একটি শিশুকে নিরাপদে পড়তে দিতে হবে, একজন তরুণকে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, একজন কর্মক্ষম মানুষকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ দিতে হবে। আর একজন মানুষকে অন্তত এই বিশ্বাসটুকু দিতে হবে- তুমি একা নও, এই সমাজ তোমারও।
যেদিন কোনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রাস্তায় হাত বাড়িয়ে নয়, নিজের কর্মস্থলে দাঁড়িয়ে দিনের শেষে সম্মানের সঙ্গে ঘরে ফিরবেন, যেদিন তৃতীয় একটি শিশুকে তার ভিন্নতার কারণে স্কুল ছাড়তে হবে না, যেদিন পরিবারের সদস্যকে লজ্জার কারণ নয়, পরিবারেরই একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করা হবে- সেদিন হয়তো আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি মানবিক সমাজের দিকে এগোব। এর আগ পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটির দিকে বিরক্ত চোখে তাকানোর আগে আমাদের একবার নিজের বিবেকের দিকে তাকানো উচিত।
কারণ প্রশ্নটি শুধু তাদের নয়, প্রশ্নটি আমাদেরও। আমরা একটি মানুষকে কোথায় দাঁড়ানোর জায়গা দিয়েছি? কোথায় তাকে স্বপ্ন দেখার অধিকার দিয়েছি? সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে, সব পথ সংকীর্ণ করে দিয়ে, তার মানবিক পরিচয়ের আগে তাকে একটি আলাদা পরিচয়ের দেয়ালে আটকে রেখে- আমরা আজও তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি এমন কেন?
অথচ একদিন হয়তো ইতিহাস আমাদের দিকেই প্রশ্ন ছুড়ে দেবে- তোমরা মানুষ ছিলে, নাকি শুধু মানুষের মতো দেখতে ছিলে?
আর সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো আমাদের কোনো উত্তর থাকবে না। শুধু নীরবতা থাকবে। আর সেই নীরবতার ভেতর থেকে বারবার ভেসে আসবে একটি প্রশ্ন-
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলো যাবে কোথায়?

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com