সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। জেলা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই জেলায় ৫৮টি বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১২১ জন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, বেপরোয়া ড্রাইভিং, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের দৌরাত্ম্য, মহাসড়কে অবৈধ ট্রলি ও থ্রি-হুইলার চলাচল এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক সিগন্যালের অভাবই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। বিশেষ করে লালমনিরহাট-বুড়িমারী ও রংপুর-কুড়িগ্রাম জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে আগস্ট মাসে হাতীবান্ধায় ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল শোরুম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং ভারী বর্ষণে সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলেছে।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মার্চ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাটগ্রাম উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ১৩টি দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে ৮ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হন। এছাড়া কালীগঞ্জে ১১টিতে ৭ জন নিহত ও ২৭ জন আহত, হাতীবান্ধায় ১০টিতে ৬ জন নিহত ও ২৬ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে আদিতমারী ও সদর উপজেলায় ৬টি করে দুর্ঘটনায় উভয় স্থানেই ৩ জন করে নিহত এবং যথাক্রমে ১৫ ও ১৮ জন আহত হয়েছেন।
বিগত বছরগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জেলায় সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র ক্রমান্বয়ে অবনতির দিকে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে ৬২টিতে ৩৭ জন, ২০২৪ সালে ৬৮টিতে ৪২ জন এবং ২০২৫ সালে ৭৫টি দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হন। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ৫৮টি দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছরই মহাসড়কের বেহাল অবকাঠামো এবং নিয়মবহির্ভূত যানবাহন চলাচলের কারণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
স্থানীয়রা এই চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি কালীগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় পা হারানো মোটরসাইকেল চালক আজহারুল ইসলাম জানান, হেলমেটবিহীন ড্রাইভার ও অননুমোদিত ভারী যান অবাধে চলাচল করলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। মাইক্রোবাস চালক হাফিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “কী বলব ভাই কষ্টের কথা, এই রাস্তা দিয়া কোনো গর্ভবতী নারীকে নিলে রাস্তাতেই বাচ্চা প্রসব হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়!”
ফায়ার সার্ভিস জানায়, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং বালুবাহী ট্রলির বেপরোয়া গতির কারণেই প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটছে। বিশেষ করে রাতের বেলা দূরপাল্লার ভারী যানগুলোর তীব্র গতির কারণে দুর্ঘটনাগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করে।
লালমনিরহাট ১০০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) জানান, অধিকাংশ রোগীই মাথায় মারাত্মক আঘাত ও অঙ্গহানি নিয়ে হাসপাতালে আসেন। জেলায় উন্নত ট্রমা কেয়ার সেন্টার ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাব থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়, যার ফলে পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।
এ বিষয়ে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) জানান, অবৈধ যান চলাচল রোধ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।