সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সরলখাঁ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষককে নিজ পদে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং প্রধান শিক্ষকের ওপর বহিরাগতদের হামলার সময় তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে অন্তত ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (বেলা বাড়ার সাথে সাথে) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
খবর পেয়ে আদিতমারী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। পরবর্তীতে আহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল এবং আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম। সেসময় শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি স্কুলে প্রবেশ করতে পারেননি এবং বাধ্য হয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
তবে কিছুদিন পর শিক্ষার পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের ভুল বুঝতে পারেন শিক্ষার্থীরা। প্রধান শিক্ষককে ছাড়া বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় তারা অবস্থান পরিবর্তন করেন। গত মাস থেকে রশিদুল আলমকে সপদে বহাল রাখার দাবিতে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে স্মারকলিপি প্রদান ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের এই দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন প্রধান শিক্ষককে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানের অনুমতি দেয়। কিন্তু স্থানীয় একটি প্রভাবশালী বহিরাগত মহল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিল, যার ফলে গত কয়েক দিন ধরেই এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
পূর্বনির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী মঙ্গলবার প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি বহিরাগত দল অতর্কিতভাবে স্কুল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে তাঁকে মারধর শুরু করে এবং জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। শিক্ষকরা হেনস্তার শিকার হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানায়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এই হামলায় প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম ছাড়াও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনোয়ারুল, হামিদুল, সিয়াম, সামিউল এবং নবম শ্রেণির রুবেলসহ মোট ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
আহত শিক্ষার্থী মনোয়ারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “আগে না বুঝে আমরা স্যারের বিরোধিতা করেছিলাম। কিন্তু বুঝতে পেরেছি তাঁকে ছাড়া স্কুলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই আমরাই তাঁকে ফেরানোর জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করি। আজ স্যার স্কুলে আসায় ৪০-৫০ জন বহিরাগত এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা এর বিচার চাই এবং প্রধান শিক্ষকের পূর্ণ পুনর্বহাল চাই।”
আহত প্রধান শিক্ষক রশিদুল আলম বলেন, “বহিরাগত একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে আমাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল। প্রশাসনের নির্দেশেই আজ স্কুলে গেলে তারা আমার ওপর হামলা চালায়। আমাকে বাঁচাতে এসে শিক্ষার্থীরাও জখম হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।”
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বাহিনী পাঠিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সরলখাঁ উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গুঞ্জন বিশ্বাস জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত রয়েছে। পুরো বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।