মাসুদ রানা মনি রামগঞ্জ (লক্ষ্মীপুর) থেকে:
জীবিকার তাগিদে মানুষ কত পেশায় না যুক্ত হয়, যার মধ্যে অন্যতম ও বেশ বিচিত্র একটি পেশা হলো কুঁচিয়া শিকার। পেট চালাতে সুদূর সিলেট থেকে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে এসে এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন একদল মানুষ। ভোরের আলো ফোটার আগেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে হাঁটুসমান পানিতে নেমে পড়েন তারা। কাঁধে বিশেষ বাঁশের তৈরি ফাঁদ ‘চাই’ আর হাতে একমুঠো কেঁচো—এই সম্বল নিয়েই শুরু হয় তাদের শিকার অভিযান। স্থানীয়ভাবে কেঁচোকে ‘মেটোসাপ’ বলা হলেও মূলত এর টোপেই ধরা পড়ে মূল্যবান কুঁচিয়া।
সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা নিতাই চন্দ্র সরকার প্রায় এক দশক আগে জীবিকার সন্ধানে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় আসেন। বর্তমানে বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। নিতাই একা নন, তার মতো আরও ২০ থেকে ২৫ জন সিলেটি মানুষ রামগঞ্জের ভোলাকোট, ভাটরা, ভাদুর, লামচর, দরবেশপুর ও চন্ডিপুর এলাকার বিভিন্ন জলাশয় ও খিল-বিলে কুঁচিয়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান, কর্মসংস্থানের অভাব এবং চরম দারিদ্র্যই তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য পেশার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কুঁচিয়া শিকার বেশ ধৈর্যের কাজ। দিনের একটা বড় অংশ চলে যায় কেঁচো সংগ্রহে। বাঁশের বিশেষ ফাঁদে কেঁচো গেঁথে তা পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় এবং পরদিন ভোরে তা তোলা হয়। কখনও ফাঁদে কুঁচিয়ার পাশাপাশি শিং, কৈ বা টাকি মাছও ধরা পড়ে। সংগৃহীত কুঁচিয়া জীবিত সংরক্ষণ করে পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। বর্ষাকালে কাজের চাপ ও আয় দুটোই বেশি থাকে, যেখানে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে বছরের বাকি সময়ে তা কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হয় তাদের।
আরেক কুঁচিয়া শিকারী স্বপন চন্দ্র জানান, জীবিকার তাগিদে দূরে থাকতে হলেও মোটামুটি আয় ভালোই হয়। তবে শীতকালে কুঁচিয়া পাওয়া যায় না বললেই চলে, তখন চরম কষ্টে দিন কাটাতে হয় এবং বাধ্য হয়ে অন্য পেশা ধরতে হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাব্বির আহমেদ সিফাত বলেন, কুঁচিয়া পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাণী। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম জানান, আমিষ ও ভিটামিনে ভরপুর কুঁচিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীজ সম্পদ। রামগঞ্জে এর স্থানীয় বাজার না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিদেশে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কেউ যদি কুঁচিয়া চাষ করতে আগ্রহী হন, তবে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।