ইবি প্রতিনিধি :
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান ‘মীর মুগ্ধ সরোবর’। শিক্ষার্থীদের কাছে ‘ইবির হাতিরঝিল’ খ্যাত এই সরোবর একসময় ছিল শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের আড্ডা ও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্র। পাশাপাশি এটি ছিল অতিথি পাখির বিচরণস্থল। তবে দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাবে ময়লা-আবর্জনা, কচুরিপানা ও শেওলায় সরোবরটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। ফলে শিক্ষার্থীদের অবকাশ যাপনের অন্যতম এ স্থানটি এখন অনেকটাই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম-উত্তরে অবস্থিত সরোবরটির পাশে রয়েছে মেডিক্যাল সেন্টার, প্রকৌশল ভবন ও আইআইইআর ভবন। পাশেই চলছে নতুন অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ। একসময় নিয়মিত পানির প্রবাহ ও অতিথি পাখির উপস্থিতিতে শিক্ষার্থী-দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করত স্থানটি। বর্তমানে কচুরিপানা, শেওলা ও ময়লা-আবর্জনায় সরোবরটির পরিবেশের অবনতি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরোবরের চারপাশে জমেছে ঝোপঝাড় ও ময়লা-আবর্জনা। পাশেই তৈরি হয়েছে ময়লার ভাগাড়, যেখান থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। সরোবরের পানিতে নেই স্বাভাবিক প্রবাহ। কচুরিপানা ও শেওলায় প্রায় পুরো লেক ঢেকে গেছে। এছাড়া আশপাশের কৃষকদের পাট ও কলাগাছের স্তূপ পড়ে থাকায় পানির স্বাভাবিক চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের কারণে সরোবরের আশপাশে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশে লেকের পরিবেশ তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লেকের ভেতরে বহিরাগতদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং রাতে স্থানীয় কিশোরদের আড্ডা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় লেকটির নামকরণ করা হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় লেক’, সংক্ষেপে ‘ইবি লেক’। পরে ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী আনুষ্ঠানিকভাবে লেকটির উদ্বোধন করেন। লেকটির পূর্বনাম ছিল ‘মফিজ লেক’। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ মীর মুগ্ধের স্মরণে লেকটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মীর মুগ্ধ সরোবর’।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ময়লার স্তূপ, পচা কচুরিপানা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে বর্তমানে লেকে বসার মতো পরিবেশ নেই। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও পরিচর্যার অভাবে সরোবরটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সরোবরটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তানজিম জামান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর মফিজ লেকই আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা মনে হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, চড়ুইভাতি, ঘোরাঘুরি ও বন্ধুদের আড্ডার অন্যতম স্থান ছিল এটি। কিন্তু বর্তমানে কচুরিপানা ও ঝোপঝাড়ে জায়গাটির বেহাল অবস্থা। ফলে শিক্ষার্থীদের আনাগোনাও দিন দিন কমছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, অযত্নের আবরণ সরিয়ে লেকটিকে তার নির্মল সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।”
গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জুই ইয়াসমিন বলেন, “মফিজ লেক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বর্তমানে ময়লা-আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন চলাচলের পথ ও গাছপালার অযত্নে লেকটির সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। ক্যাম্পাসের পেছনের দিকে হওয়ায় জায়গাটিতে প্রশাসনের নজরও তুলনামূলক কম। প্রশাসনের সঠিক পরিচর্যার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলে লেকের পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতন হতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন অভয়াণ্যের পরিচালক সাদিয়া আফরিন বলেন, “মীর মুগ্ধ সরোবর বর্তমানে উদ্বেগজনক পরিবেশগত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না করা, ময়লা-আবর্জনা ফেলা ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শুধু একবার পরিষ্কার করলেই হবে না, সরোবরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। নিয়মিত পরিষ্কার, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, পানি ও মাটি পরীক্ষা এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধে নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালে পানি শুকিয়ে গেলে কৃত্রিমভাবে পানির প্রবাহ চালুর ব্যবস্থা করতে হবে। শীতকালে অতিথি পাখির বিচরণ বিবেচনায় সরোবরটিকে বিশেষ অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের সভাপতি মিলন রানা বলেন, “মীর মুগ্ধ সরোবর বর্তমানে কচুরিপানা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের অভাব ও আশপাশের সবুজায়নের অপর্যাপ্ত পরিচর্যাসহ নানা পরিবেশগত সমস্যায় ভুগছে। এতে সরোবরের সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত কচুরিপানা অপসারণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ফেলা রোধে নজরদারি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে স্টেট অফিসের প্রধান আলাউদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কচুরিপানার সমস্যাটি এই মুহূর্তে ঠিক করা সম্ভব না। এটি সমাধান করতে এক লাখের বেশি টাকার দরকার। লেকের পানি শুকিয়ে গেলে তখন অল্প খরচে আমরা এটা সমাধান করতে পারব। উপাচার্য স্যারের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত লেক ও আইআইইআর ভবনের সামনের পুকুরের সংস্কারকাজ শুরু করার চেষ্টা করব।”