রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন
Title :
সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে ইউএস ওপেনের নতুন রানি রাইবাকিনা সাবালেঙ্কাকে হারিয়ে ইউএস ওপেনের নতুন রানী রিবাকিনা বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচতে ডেকে দুই নৃত্যশিল্পীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২ বাংলাদেশি নিহত সরকারি পে-স্কেল অনুমোদন: বেসরকারি কর্মীদের বেতন-চাকরির সুরক্ষা কতদূর? পুকুরে স্যান্ডেল ভাসতে দেখে উদ্ধার করা হলো ভাই-বোনের মরদেহ ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ ২২ বছর আগের ভ্রূণ থেকে মা হলেন গ্রিক নারী দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দাপুটে জয়ে সিরিজ রিশাদ-সাইফদের দখলে গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, গ্রেফতার ২৫ জন রিমান্ডে

ছেঁচড়া চোর ‘নেয়ামত’, শিক্ষিত চোর ‘কেয়ামত’:

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৪ Time View
102

চুরির নৈতিক কোনো সমর্থন নেই, কিন্তু সমাজে এর প্রভাব ও পরিণাম বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত সত্য বেরিয়ে আসে। আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করা অশিক্ষিত ছেঁচড়া চোরদের কারণে আমরা বিভিন্ন ধরনের তালা ক্রয় করি, গ্রিল লাগাই বা দারোয়ান নিয়োগ দেই। অর্থাৎ, তাদের অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতিতেও একটি সমান্তরাল অর্থনীতি সচল থাকে। কিন্তু যারা কলমের এক খোঁচায় কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে, সেই শিক্ষিত চোররা কেবল অর্থই চুরি করে না, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

অশিক্ষিত বা নিম্নবিত্ত চোরদের চুরির ভয় সমাজকে সজাগ রাখে। এই সজাগ থাকার তাগিদে তৈরি হয়েছে বিশাল এক ব্যবসায়িক খাত। যেমন—- নিরাপত্তা শিল্প: তালা-চাবি, শক্তিশালী কলাপসিবল গেট, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং উন্নত প্রযুক্তির সেন্সর তৈরির কারখানাগুলো সচল রয়েছে এই চুরির ভয়েই।
কর্মসংস্থান: হাজার হাজার মানুষ আজ সিকিউরিটি গার্ড বা নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করছেন। পাড়ায় পাড়ায় পাহারাদারদের বেতন হচ্ছে এই অশিক্ষিত চোরদের অস্তিত্বের কারণেই।
প্রযুক্তি ও ডিজিটাল কর্মসংস্থান— চোরদের চতুরতা যত বাড়ছে, প্রযুক্তির ব্যবহার তত বাড়ছে, যেমন— সিসিটিভি ও নজরদারি: এখন কেবল ক্যামেরা লাগালেই হয় না, তার জন্য দরকার হয় হাই-স্পিড ইন্টারনেট, রাউটার এবং ক্লাউড স্টোরেজ।
দক্ষ জনবল: এই ইন্টারনেট সেটিং, আইপি ক্যামেরা কনফিগারেশন এবং মনিটরিং করার জন্য হাজার হাজার আইটি টেকনিশিয়ানের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ, চোরের ‘ভয়’ পরোক্ষভাবে দেশকে ডিজিটালাইজেশনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি বীমা ও নিরাপত্তা সেবা (Insurance & Security Services) বিশ্বজুড়ে এবং বর্তমানে আমাদের দেশেও ‘নিরাপত্তা’ একটি বড় ব্যবসা। বড় বড় কোম্পানি তাদের গুদাম বা শোরুমের, বাসা বাড়ি চুরির ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বিমা করে, যা বিমা খাতের মুনাফা বাড়ায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষুদ্র অপরাধে জড়িত চোরদের অনেক সময় আইনের হাতে তুলে না দিয়ে আমরা গণপিটুনির মতো নিষ্ঠুর পথে ঠেলে দিই। অথচ অনেক ক্ষেত্রে অভাব-অনটনই তাদের ভুল পথে ঠেলে দেয়। এভাবে শাস্তির নামে প্রাণহানি ঘটিয়ে আমরা ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করি। কিন্তু আইন অশিক্ষিত চোরের বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সাজা ধরন গুলো পর্যালোচনা করি।
সাধারণ চুরির সাজা (ধারা ৩৭৯) সাধারণ কোনো বস্তু চুরি করে, তবে তার সর্বোচ্চ সাজা: ৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, অথবা- অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
বাসগৃহ বা ভবন থেকে চুরি (ধারা ৩৮০)
যদি চোর কোনো মানুষের বসবাসের ঘর, তাবু বা জাহাজে ঢুকে চুরি করে (যা সাধারণত ছিঁচকে চোরেরা করে থাকে), তবে আইনের দৃষ্টিতে এটি গুরুতর অপরাধ। এর সাজা: সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, এবং অবশ্যই অর্থদণ্ড।
প্রস্তুতিসহ চুরি (ধারা ৩৮২)
যদি চোর চুরি করার সময় সাথে কোনো অস্ত্র রাখে বা কাউকে আঘাত করার বা ভয় দেখানোর প্রস্তুতি নিয়ে আসে, তবে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সাজা: সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড, এবং অর্থদণ্ড।
অশিক্ষিত চোর-এদের চুরির ব্যাপ্তি সীমিত—একটি মুঠোফোন, কিছু স্বর্ণালঙ্কার বা বাইসাইকেল কিংবা ঘরের আসবাবপত্র। এতে একজন ব্যক্তি সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে ধস নামে না। তাই সমাধান হওয়া উচিত আইনের শাসন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

শিক্ষিত চোরদের অকল্যাণের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব।শিক্ষিত চোর: জাতির জন্য ‘কেয়ামত’ কেন– দেখুন অশিক্ষিত চোরেরা পকেট কাটে, আর শিক্ষিত চোরেরা কাটে দেশের ফুসফুস। এরা টাই-কোট পরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
অর্থ কেলেঙ্কারি ও লুটপাট: ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ বা শেয়ার বাজারের কারসাজি কোনো অশিক্ষিত চোরের কাজ নয়। এটি উচ্চ শিক্ষিতদের সুপরিকল্পিত অপরাধ।
এই চোরদের পাচারকৃত অর্থের খতিয়ান (সর্বশেষ তথ্য ও রিপোর্ট অনুযায়ী) শ্বেতপত্র কমিটির রিপোর্ট (ডিসেম্বর ২০২৪) বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ কোটি টাকা এটি করেছে শিক্ষিত শাসনের সর্বোচ্চ স্থানে বসা লোকরা।

অন্য এক পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে ১১টি শিল্প গ্রুপ ব্যাংক লুটে ব্যস্ত, সেখানে আমলা ও প্রভাবশালীরা ঘুষের প্রায় ২.৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছেন দুবাই-কানাডায়; এই ‘শিক্ষিত’ চুরির ক্ষত সারাতে এখন আন্তর্জাতিক ল ফার্মের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে।”
ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে পাচার এমন একটি সংস্থার রিপোর্টে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে কেবল ঘুষ থেকেই আমলা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা প্রায় ২.৫ থেকে ২.৮ লাখ কোটি টাকা আয় করেছে, যার একটি বড় অংশই দুবাই, কানাডা (বেগম পাড়া), যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডনে পাচার হয়েছে। শিক্ষিত চোর যখন লাখ কোটি টাকা পাচার করে, তখন দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবক বেকার হয়ে পড়ে, কলকারখানা বন্ধ হয় এবং সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতের দাম বেড়ে যায়।”
যখন কোনো নীতিনির্ধারক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দুর্নীতি করেন, তখন সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়। এটি সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় ‘কেয়ামত’ বা মহাবিপদ।

উচ্চশিক্ষিত চোর বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষা অর্জন করে অনৈতিক এবং বিবেকহীন কাজগুলো করছেন এবং যারা সমর্থন করছেন! কেন করছেন? মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই চোর আর দুর্নীতি পরায়ণ প্রোডাক্ট তৈরি করে তাহলে কি করে এই জাতি একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন করবে।
দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেন নৈতিক এবং দেশপ্রেমিক চরিত্রবান সুশীল সমাজ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে? কেন আমলারা অর্থের জন্য নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছে? কেন শিক্ষিত সুশীল ব্যক্তিরা টকশোতে বসে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করে যাচ্ছে? এগুলোর মূল কারণ হচ্ছে আমরা শিক্ষিত হচ্ছি কিন্তু সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত হতে পারছি না।
অ্যারিস্টটলের বলেছিলেন—-
দর্শন অনুযায়ী, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কেবল মস্তিস্ককে তথ্যে সমৃদ্ধ করছে (Informative), কিন্তু হৃদয়কে নৈতিকতায় রূপান্তর (Transformative) করতে পারছে না। ফলে একজন শিক্ষার্থী গাণিতিক বা অর্থনৈতিক থিওরি শিখলেও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা শিখছে না। মূলত, চারিত্রিক উৎকর্ষহীন এই শিক্ষা মানুষকে দক্ষ বানালেও প্রকৃত ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ম্যাকিয়াভেলিয়ান দর্শন ও সফলতার নিয়ে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সমাজ সফলতার একটি বস্তুবাদী (Materialistic) সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে। আমরা তাকেই সফল বলি যার অনেক টাকা, বড় গাড়ি বা বিদেশে বাড়ি আছে। এই চিন্তাধারা থেকে জন্ম নেয় ম্যাকিয়াভেলিবাদ, যেখানে “উদ্দেশ্যই উপায়কে বৈধ করে” (The ends justify the means)। অর্থাৎ, ডিগ্রিধারী চোরটি মনে করে—টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে যদি সে ‘সফল’ হতে পারে, তবে সেই পথ নৈতিকভাবে ভুল হলেও সামাজিক ভাবে গ্রহণযোগ্য।
দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট– মনে করতেন, শিক্ষা হওয়া উচিত মানুষের ‘মর্যাল এজেন্সি’ বা নৈতিক সত্তাকে জাগ্রত করার মাধ্যম। যখন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একজন গ্র্যাজুয়েট অর্থ পাচার করেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের সিলেবাসে ‘এথিকস’ (Ethics) বিষয়টি কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। এটি শিক্ষার্থীর অবচেতনে প্রবেশ করতে পারেনি। এটি শিক্ষার ব্যর্থতা নয় বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ‘আত্মার মৃত্যু’।

আমরা যদি কেবল প্রযুক্তিবিদ বা আমলা তৈরি করি যারা নৈতিকতাহীন, তবে আমরা আসলে সুশিক্ষিত ডাইনোসর তৈরি করছি যারা সুযোগ পেলেই নিজের জননীকে (দেশকে) গ্রাস করবে। শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল মানুষকে ‘মানুষ’ করা, কেবল ‘টাকার যন্ত্র’ নয়।

বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক, সহযোগিতামূলক নয়। এটি শেখায় কীভাবে অন্যকে ছাড়িয়ে উপরে উঠতে হয়, কিন্তু এটি শেখায় না যে সমষ্টির ক্ষতি করে নিজের উন্নতি আসলে এক ধরনের আত্মহনন। সুতরাং সেই শিক্ষাব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন চাই—
প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে বাধ্যতামূলক করা।
দেশপ্রেম কেবল জাতীয় সংগীতে সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের সম্পদের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করা।
শিক্ষকদের অনৈতিক রাজনীতিকরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শের সংকট তৈরি করছে, তাই জাতির মেরুদণ্ড রক্ষায় শিক্ষকদের সামাজিক ও নৈতিক মানদণ্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আজ অপরিহার্য।
রাস্তার চোরকে আমরা গণপিটুনি দিই, কিন্তু ড্রয়িংরুমে বসা বড় চোরদের আমরা স্যার সম্বোধন করি। ছেঁচড়া চোরদের হাত থেকে বাঁচতে আমরা তালা কিনি, যা অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র হলেও ইতিবাচক চক্র তৈরি করে। কিন্তু শিক্ষিত চোরদের দুর্নীতির যে ‘তালা’ তা খোলার ক্ষমতা সাধারণ জনগণের নেই। সমাজকে বাঁচাতে হলে অশিক্ষিত চোরের সিঁধকাঠি নয়, বরং শিক্ষিত চোরের দুর্নীতিবাজ কলমকে রুখে দেওয়া আজ সময়ের দাবি।
পরিশেষে বলবো—”অশিক্ষিত চোরেরা যদি হয় অনিচ্ছাকৃত উদ্যোক্তা তৈরির কারণ, তবে শিক্ষিত চোরেরা হলো অর্থনীতির ক্যান্সারের জীবাণু।”

মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ নিউইয়র্ক।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com