সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটের তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও ধলাই নদী থেকে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে অবাধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন। জেলার প্রায় ১৮০ কিলোমিটার এলাকজুড়ে চলা এই অবৈধ কার্যক্রমের কারণে নদীগুলোর স্বাভাবিক ভৌগোলিক রূপ ও মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দিন-রাত ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন বসিয়ে বালু তোলার ফলে নদী তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন।
পরিবেশ গবেষকদের মতে, নদীর প্রাকৃতিক পলিপ্রবাহ ও তলদেশের অবস্থা বিবেচনা না করে যত্রতত্র বালু তোলা হচ্ছে। তিস্তা নদীর মতো মধ্যম মাত্রার বালুময় নদী থেকে পরিবেশের ক্ষতি এড়াতে বৈজ্ঞানিক জরিপ সাপেক্ষে বছরে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ লাখ ঘনমিটার বালু তোলার সুযোগ থাকলেও, বাস্তবে উত্তোলন করা হচ্ছে এর চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি। এছাড়া নিয়ম ভেঙে আবাদি জমির তলদেশ থেকে ১০ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে বালু তোলায় বর্ষাকালে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং তীব্র ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তীর ঘেঁষে ড্রেজিং করায় ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়ে ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ধান, ভুট্টা ও তামাক চাষের উর্বর জমি ধসে পড়ে কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য নদীর গবেষণায় অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ভূমি ক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
‘তিস্তা নদী বাঁচাও আন্দোলনের’ গবেষক মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণেই লালমনিরহাটে তিস্তার ভাঙন বহুগুণ বেড়ে গেছে। কালীগঞ্জ ও পাটগ্রাম উপজেলার একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দা তাদের আবাদি জমি ও বসতভিটা হারানোর করুণ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং নদী ও ফসলি জমি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ড্রেজার জব্দ ও জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল রাজস্বের কথা না ভেবে বাথামেট্রিক সার্ভে এবং কঠোর আইনি তদারকি নিশ্চিত করা না হলে লালমনিরহাটের নদীব্যবস্থা ও কৃষি স্থায়ীভাবে ধ্বংসের মুখে পড়বে।