রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২১ অপরাহ্ন

রায়পুরা প্রেক্ষাপট: সাংবাদিক বিনার পেছনে লাগার কারণ কি?

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ২০ Time View
25

মোঃ মাইন উদ্দিন :
সম্প্রতি “রায়পুরা প্রেক্ষাপট” নামের একটি ফেসবুক পেইজ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বিনা নামের একজন নারী সাংবাদিককে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে গুরুতর অভিযোগ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছড়ানোর বিষয়টি সমাজে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে- এর পেছনে লাগার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি? ব্যক্তিগত বিরোধ, পেশাগত মতপার্থক্য, নাকি সত্যিই কোনো অনিয়মের তথ্য রয়েছে?
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অভিযোগ যত গুরুতর হবে, তার পক্ষে প্রমাণের দায়ও তত বেশি।
সাংবাদিক বিনার বিরুদ্ধে দাবি করা হচ্ছে, তিনি একজন বালু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছেন। এত বড় একটি আর্থিক অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই জানতে ইচ্ছা করে- এই দাবির ভিত্তি কি? অর্থ লেনদেনের কোনো ব্যাংক তথ্য, আর্থিক নথি, লিখিত অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো সংস্থার আনুষ্ঠানিক তথ্য কি রয়েছে? যদি সত্যিই এমন অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে তার প্রমাণ কোথায়?
একইভাবে, সাংবাদিক বিনাকে ‘নারী ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এটিও একটি নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য পরিচয়গত দাবি। এর পক্ষে সরকারি নথি, ব্যবসায়িক কাগজপত্র, আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত, তদন্ত প্রতিবেদন অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য আছে কি না- সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে একটি পরিচয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া আর প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।
এখানে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- যদি অভিযোগের পক্ষে সত্যিই অকাট্য প্রমাণ থাকে, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক পোস্ট ও অভিযোগের পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হচ্ছে না কেন? অপরাধের বা অভিযোগের বিচার করার দায়িত্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়। প্রমাণ থাকলে তদন্তের সুযোগ রয়েছে, অভিযোগ জানানোর আইনগত পথ রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো আদালত নয়। সেখানে অভিযোগ উঠলেই একজন মানুষ অপরাধী হয়ে যান না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ, অভিযুক্তের বক্তব্য গ্রহণ এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কোনো অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা আরও বেশি প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত বিরোধ বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সাংবাদিকের কোনো প্রতিবেদন নিয়ে কারও ক্ষোভ থাকতে পারে, সাংবাদিকের সঙ্গে সাংবাদিকের ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিরোধ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই বিরোধ যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন নারীর ব্যক্তিগত মর্যাদা, সামাজিক সম্মান ও পেশাগত পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ঘতা নৈতিকতারও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
অভিযোগ সত্য হলে প্রমাণ সামনে আসুক, তদন্ত হোক এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকলে, অনুমান, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অন্যের সুনাম ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অভিযোগ করা সহজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া আরও সহজ, কিন্তু একটি মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই ক্ষতি ফিরিয়ে দেওয়া অনেক কঠিন। তাই প্রশ্নটা সাংবাদিক বিনাকে ঘিরে যতটা, তার চেয়ে বেশি প্রশ্নটি আমাদের দায়িত্বশীলতা, প্রমাণনির্ভর বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নৈতিকতা নিয়ে- অভিযোগ থাকলে প্রমাণ দিন, প্রমাণ থাকলে আইনের পথে যান, আর প্রমাণ না থাকলে কাউকে সামাজিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com