মোঃ মাইন উদ্দিন :
সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু একদিনে ঘটে না। কোনো এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায় না- সাংবাদিকতা আর বেঁ’চে নেই। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে, নীরবে, অদৃশ্য ক্ষয়ে তার মৃ’ত্যু ঘটে। আর এই মৃ’ত্যু’র জন্য শুধু ক্ষ’ম’তা’বা’ন, রাজনৈতিক দল কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দায়ী করলেই সত্যের পুরোটা বলা হয় না। অনেক সময় সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু’র মিছিলে সাংবাদিকরা নিজেরাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটেন।
এরিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী। এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনীতি মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন সাংবাদিকও সমাজের বাইরে নন। তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত থাকতে পারে, কোনো দল বা মতাদর্শের প্রতি তাঁর সমর্থন থাকতে পারে- এটি তাঁর নাগরিক অধিকার।
কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় ঠিক তখনই, যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাস আর পেশাগত দায়িত্ব মুখোমুখি দাঁড়ায়।
একজন সাংবাদিক কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন, কিন্তু দলের অন্ধ ভক্ত হতে পারেন না। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের ভালো কাজের প্রশংসা করবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দল ভুল করলে, অ’ন্যা’য় করলে, মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করলে কিংবা ক্ষ’ম’তা’র অপব্যবহার করলে সাংবাদিকের কলম থেমে যেতে পারে না।
কারণ সাংবাদিকের প্রথম আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষ’ম’তা’কে’ন্দ্রে’র প্রতি নয়- সত্য, ন্যায় ও মানুষের প্রতি।
যে সাংবাদিক ক্ষ’ম’তা’বা’নদের ভুলকে ভুল বলতে ভ’য় পান, তিনি ধীরে ধীরে সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরে যান। যে সাংবাদিক নিজের পছন্দের দলের অ’ন্যা’য়’কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দিতে শুরু করেন, তাঁর কলম তখন আর কলম থাকে না- তা হয়ে ওঠে প্রচারের হা’তি’য়া’র। আর যে সাংবাদিক অন্যের দু’র্নী’তি দেখেন, কিন্তু নিজের ঘরের অ’ন্যা’য় দেখেও নীরব থাকেন, তাঁর নিরপেক্ষতার মুখোশ একদিন না একদিন খুলে পড়বেই।
সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু ঘটে তখনই, যখন সত্য খবরের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বড় হয়ে যায়। যখন সংবাদ প্রকাশের আগে ভাবতে হয়- কে রাগ করবে, কে খুশি হবে, কার ফোন আসবে, কার বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে! যখন সংবাদকর্মী সত্যের অনুসন্ধানী না হয়ে কারও মুখপাত্রে পরিণত হন।
সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু ঘটে তখনও, যখন খবরের বদলে পরিচয়, নীতি ও আদর্শের বদলে সুবিধা, আর সত্যের বদলে পক্ষপাত জায়গা করে নেয়।
একজন সাংবাদিক, লেখক, কবি কিংবা শিল্পী কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতেই পারেন। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতা, বিবেক ও সত্য বলার সা’হ’স যদি দলীয় আনুগত্যের কাছে বন্দি হয়ে যায়, তাহলে তিনি হয়তো শারীরিকভাবে বেঁ’চে থাকেন- কিন্তু তাঁর সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তখন মৃ’ত্যু’ব’র’ণ করে।
সাংবাদিকতা কোনো দলের দাসত্ব করার পেশা নয়। সাংবাদিকতা হলো ক্ষ’ম’তা’কে প্রশ্ন করার সাহস। অ’ন্যা’য়ে’র বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব। মানুষের না-বলা কথাকে সমাজের সামনে তুলে ধরার অঙ্গীকার।
যে সাংবাদিক ক্ষ’ম’তা’র কাছে নতজানু হন, তিনি হয়তো কিছুদিন সম্মান, সুবিধা কিংবা পরিচিতি পেতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস কখনো তাঁকে সত্যের কলম সৈনিক হিসেবে মনে রাখে না।
সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু কে ঘটায়?
ক্ষ’ম’তা’বা’ন’রা যখন সত্যকে ভ’য় দেখায়- তখন তারা সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করে।
রাজনৈতিক দল যখন সমালোচনা সহ্য করতে পারে না- তখন তারা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত করে।
মালিকপক্ষ যখন সংবাদকে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করে- তখন সাংবাদিকতার নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আর সাংবাদিক নিজেই যখন সত্যের বদলে সুবিধাকে বেছে নেন- তখন সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু সম্পূর্ণ হয়।
তাই সাংবাদিকতার মৃ’ত্যু শুধু বাইরে থেকে আসে না, কখনো কখনো তা জন্ম নেয় সাংবাদিকের নিজের বিবেকের ভেতরেই।
সাংবাদিকতা বাঁ’চা’তে হলে সবার আগে বাঁ’চা’তে হবে সত্য বলার সা’হ’স। বাঁ’চা’তে হবে প্রশ্ন করার অধিকার। বাঁচাতে হবে ভুলকে ভুল বলার নৈতিক শ’ক্তি।
কারণ একজন সাংবাদিকের পরিচয় তিনি কোন দলের- তা নয়।
সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো- সত্যের সামনে তিনি কতটা সৎ ও নির্ভিক।