ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুধু আগুনের ভয়াবহতাই সামনে আসেনি, বরং প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। আটতলা বিশিষ্ট ওই ভবনে মোট পাঁচটি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও, জরুরি নির্গমনের বিকল্প পথ হিসেবে কেবল একটি সিঁড়ি খোলা রাখা হয়েছিল। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। এর ফলে আগুন লাগার পর আতঙ্কিত রোগী এবং তাদের স্বজনেরা ভবন থেকে নিচে নেমে আসার জন্য একটিমাত্র সিঁড়ির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে হুড়োহুড়ি ও চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং অনেকেই পদদলিত হয়ে আহত হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও পলায়নরত সাধারণ মানুষের বর্ণনা অনুযায়ী, এই তালাবদ্ধ ব্যবস্থার কারণে তাঁদের আতঙ্ক বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে শয্যাশায়ী রোগী, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করে। অনেককে জীবন বাঁচাতে নিজেদের চেষ্টাতেই তালা ও গ্রিল ভেঙে বাইরে বের হতে হয়েছে। ঘটনার পর সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সিঁড়িগুলোর কোনো কোনো গেটে তখনো মরিচা ধরা তালা ঝুলছে এবং কোথাও কোথাও ভাঙা গেটের চিহ্ন স্পষ্ট রয়েছে। আগুন কিংবা ধোঁয়ার চেয়েও দ্রুত বের হওয়ার অনিশ্চিত পথই যে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঘটনার নেপথ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যে কিছু অমিল পাওয়া গেছে, যা বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে নিরাপত্তার কারণে নিয়মিত ব্যবহারের বাইরে অন্য সিঁড়িগুলো বন্ধ রাখা হতো। তবে ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তার কথা বলে কেবল দুটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে তারা জেনেছে। এই দুই পক্ষের বক্তব্যের ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে জরুরি নির্গমন পথগুলোর সঠিক তদারকি ও সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক গাফিলতি ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এদিকে, ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে লিফটের কন্ট্রোল রুম ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে অতিরিক্ত তাপ বা বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১১ নম্বর লিফটটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অকেচল থাকলেও সেটির বিদ্যুৎ-সংযোগ চালু ছিল, যার ফলে কন্ট্রোল রুমের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো সক্রিয় ছিল। আগুন লাগার কারণ উদঘাটন এবং সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে ইতোমধ্যে একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে আগুনের উৎসের পাশাপাশি জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ থাকার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
হাসপাতালের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনবহুল প্রতিষ্ঠানে বিকল্প নির্গমন পথগুলোর এই বেহাল দশা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের মতে, আগুন বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাৎক্ষণিকভাবে ভবন খালি করার জন্য সব কটি সিঁড়ি উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে তা না থাকায় হুড়োহুড়িতে রোগীদের দুর্দশা চরমসীমায় পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকলেই একটি হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; বরং জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী ও স্বজনরা যাতে নির্বিঘ্নে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পারেন, সেই পথগুলো সবসময় মুক্ত রাখা এবং নিয়মিত মহড়ার আয়োজন করা জরুরি। আগামী দিনে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে হাসপাতালের জরুরি নির্গমন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অব্যবস্থাপনাগুলোর স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর হাসপাতালের নিরাপত্তা নীতিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় না থেকে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় হাসপাতালের প্রতিটি ব্লকের বিকল্প পথগুলো এখনই ব্যবহারোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।