বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা ও দলের রাজনৈতিক অবদান কোনো অপচেষ্টার মাধ্যমেই মুছে ফেলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলটির প্রধান তারেক রহমান। সম্প্রতি বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি বা সরাসরি যুক্ত হয়ে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, যতই আইনি মারপ্যাঁচ বা চক্রান্ত করা হোক না কেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ধারার ইতিহাস থেকে এই দলকে বাদ দেওয়ার সাধ্য কারও নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন প্রোপাগান্ডার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার হাতেই এ দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে এবং এই সত্যকে কোনোভাবেই বিকৃত করা যাবে না। স্বাধীনতাত্ত্ববর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলেও সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত ছিল এবং তৎকালীন সময়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাধারণ মানুষের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লাখো মানুষের আত্মত্যাগের পর যখন দেশে চরম রাজনৈতিক হতাশা বিরাজ করছিল, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি দেশে দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে পুনরায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা উন্মুক্ত করেন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তারেক রহমান আরও বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জিয়াউর রহমান দেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির পত্তন করেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা সুসংহত হয় এবং নারীর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অবৈতনিক করাসহ বিভিন্ন কল্যাণমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমে টেকসই গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করা হয়। এ ছাড়া, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের সাংবিধানিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় দলটির ভূমিকা অবিস্মরণীয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি সবসময় জনগণের পাশে থেকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন দলের প্রধান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের স্বাধীনতা রক্ষা, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার কিংবা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হোক—প্রতিটি জটিল পরিস্থিতিতে জিয়া পরিবার ও বিএনপি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছে। বিশেষ করে, গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বিএনপি সবসময় অগ্রভাগে ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা ধরনের নিপীড়ন, দমন-পীড়ন এবং অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেও দলটির নেতাকর্মীরা কখনো রাজপথ ছেড়ে যাননি বা আত্মগোপন করেননি। জনগণের মৌলিক অধিকার ও ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে তারা সবসময় প্রকাশ্য রাজপথে বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করেছেন এবং জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।
আলোচনা সভার সার্বিক আয়োজন ও পরিচালনা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মাহবুবউল্লাহসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য প্রদান করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমানউল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম এবং ইসমাইল জবিহউল্লাহ। এ ছাড়াও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এম মোনায়েম মুন্না, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান এবং ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ। উক্ত অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান ও ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা উপস্থিত ছিলেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভাটি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও প্রেরণা জুগিয়েছে বলে সভায় উপস্থিত বক্তারা মনে করেন।