শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ অপরাহ্ন

কর্পোরেট জীবনের সফলতা ছেড়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে আব্দুল্লাহ আল কাইউম

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫০ Time View
53

মোঃ মাইন উদ্দিন :
সব মানুষের জীবন এক পথে এগোয় না। কেউ নিজের সাফল্যের সীমানায় থেমে যান, আবার কেউ ব্যক্তিগত অর্জনের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যের জীবন বদলের স্বপ্ন দেখেন। আব্দুল্লাহ আল কাইউম তেমনই একজন মানুষ, যিনি কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠিত অবস্থান থেকে ফিরে এসে নিজের জন্মভূমির অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিয়েছেন।
করোনাকালের কঠিন ও অনিশ্চিত সময়ে যখন মানুষ আতঙ্ক, সংকট ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল, তখন নিজের এলাকার মানুষের দুর্দশা তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় মানবিক কাজের এক ভিন্ন যাত্রা। রক্তের প্রয়োজনে ছুটে যাওয়া, অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবন্ধী মানুষের চলার পথ সহজ করা কিংবা গৃহহীন মানুষের মাথার ওপর একটি ছাদের ব্যবস্থা- মানবসেবার এসব কাজ ধীরে ধীরে আব্দুল্লাহ আল কাইউমের জীবনের অন্যতম পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
আব্দুল্লাহ আল কাইউম ১৯৮৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সালুয়া গ্রামের নাজিরের বাড়ি খ্যাত বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আব্দুর রাশিদ মিয়া এবং মা সাফিয়া খাতুন। তাঁর দাদা ছিলেন আইনুল হক, যিনি এলাকায় নিবু মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন।
শৈশব থেকেই এই জনপদের মাটি ও মানুষের সঙ্গে বেড়ে ওঠা আব্দুল্লাহ আল কাইউমের শিক্ষাজীবনের শুরু ফরিদপুর ইউনিয়নের ৩৭নং ফরিদপুর-আলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৯২ সালে তিনি সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। প্রাথমিক পেরিয়ে ১৯৯৭ সালে ভর্তি হন ফরিদপুর আব্দুল হামিদ ভূইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০২ সালে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি নরসিংদীর বেলাব হোসেন আলী সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ভৈরব হাজী আছমত কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন দেশের স্বনামধন্য এক রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে। কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন বেসটেক ফ্যাশন লিমিটেড এবং আরিয়ান ফ্যাশন লিমিটেডে। পরবর্তীতে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কর্পোরেট কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পন্ন করেন।
তবে পেশাগত সাফল্যই তাঁর জীবনের শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠেনি। করোনাকাল তাঁর জীবনের গতিপথে যেন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। মানুষের অসহায়ত্ব, চিকিৎসার সংকট, রক্তের অভাবে রোগীর স্বজনদের দৌড়ঝাঁপ এবং দরিদ্র মানুষের নিত্যদিনের সংগ্রাম তাকে মানবিক কাজে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে।
আর এরই ধারাবাহিকতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সালুয়া ইউনিয়ন ব্লাড ডোনার্স ক্লাব। সংগঠনটির মাধ্যমে নতুন রক্তদাতা তৈরি, স্বেচ্ছাসেবক গড়ে তোলা এবং মুমূর্ষু রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রক্তের ব্যবস্থা করতে কাজ শুরু করেন। স্থানীয় পর্যায়ে অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবীকে যুক্ত করে রক্তদানের একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর এই উদ্যোগের মাধ্যমে বহু মানুষ প্রয়োজনের সময়ে রক্ত পেয়েছেন এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।
মানবিক কর্মকাণ্ডকে আরও সংগঠিত ও বিস্তৃত করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এতিম অসহায় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের সহযোগিতায় সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সংগঠনটি।
সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অসচ্ছল পরিবারকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে সেলাই মেশিন প্রদান, চলাচলে অক্ষম মানুষের জন্য হুইলচেয়ার বিতরণ এবং গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণে সহযোগিতা। পাশাপাশি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহায়তা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট নিরসনে টিউবওয়েল স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মসজিদ, মাদ্রাসা ও হতদরিদ্র পরিবারের মাঝেও বিভিন্ন সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এই মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে।
শুধু মানুষের তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলাই নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে তাঁর কার্যক্রমে। ‘আসুন সবুজ কুলিয়ারচর গড়ি’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ফলজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণ এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আব্দুল্লাহ আল কাইউম ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। তিনি একটি ওষুধ কোম্পানির ডিলারশিপ ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
নিজের উপার্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘আব্দুর রাশিদ সাফিয়া খাতুন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার করছেন।
আব্দুল্লাহ আল কাইউমের জীবনের গল্প শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের উপলব্ধির গল্প, যেখানে নিজের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি উপলব্ধি করেছেন, সমাজে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারার মধ্যেই।
আজকের বাস্তবতায়, যখন ব্যক্তিস্বার্থের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মানবিকতা আড়ালে পড়ে যায়, তখন আব্দুল্লাহ আল কাইউমের মতো মানুষের উদ্যোগ সমাজকে অন্য এক বার্তা দেয়। একটি রক্তের ব্যাগ হয়তো একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে, একটি হুইলচেয়ার বদলে দিতে পারে কারও চলার পথ, একটি সেলাই মেশিন এনে দিতে পারে একটি পরিবারের স্বাবলম্বিতার সুযোগ, আর একটি ঘর দিতে পারে গৃহহীন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়।
মানুষের জন্য কাজ করার এই দর্শন নিয়েই এগিয়ে যেতে চান আব্দুল্লাহ আল কাইউম।
তাঁর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসা জীবনের গল্পে যোগ হয় ব্যক্তিজীবন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্রসন্তানের জনক। পরিবার, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও মানুষের জন্য কিছু করার যে দায় তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, সেটিই ধীরে ধীরে তাকে এই জনপদে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
তাঁর পথচলা এখনও শেষ হয়নি। বরং মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই পথচলা যেন প্রতিদিন নতুন করে শুরু হচ্ছে।
কারণ কিছু মানুষ নিজের জন্য বাঁচেন, আর কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন অন্যের জীবনে একটু আলো জ্বালানোর জন্য। আব্দুল্লাহ আল কাইউমের গল্প সেই দ্বিতীয় পথেরই গল্প।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com