ইমাম হাছাইন পিন্টু, নাটোর
তীব্র গরম এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের জেরে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা তালপাতার হাতপাখা হয়ে উঠেছে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বস্তির বড় মাধ্যম। গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামীণ জনপদে এই পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
নাটোরের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজারের স্থানীয় হাতপাখা বিক্রেতা রায়হান আলী জানান, বাঁশের কঞ্চি, সুতা ও তালপাতার সমন্বয়ে এসব পাখা তৈরি করা হয়ে থাকে। প্রথমে কাঁচা তালপাতা সংগ্রহ করে কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর রোদে শুকানো হয়। এরপর স্থানীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সাহায্যে নির্দিষ্ট আকৃতি দিয়ে সুতা দিয়ে মজবুত করে হাতল জুড়ে দেওয়া হয়। সবশেষে রঙের ছোঁয়া দিলে পাখাগুলো বিক্রির উপযোগী হয়।
কারিগর রায়হান আরও জানান, মজুরি, কাঁচামাল সংগ্রহ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ মিলিয়ে একটি পাখা উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা। একজন দক্ষ কারিগর দিনে সর্বোচ্চ ৩০টি পর্যন্ত পাখা তৈরি করতে পারেন। পরবর্তীতে আকার ও মানভেদে প্রতিটি পাখা ২০ থেকে ৫০ টাকায় বাজারে বিক্রি হয়। এই পেশার মাধ্যমেই বহু কারিগরের পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।
এয়ার কন্ডিশনার ও প্লাস্টিকের পাখার যুগে এই শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে ছিল। তবে অসহ্য লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ এখন পুনরায় প্রকৃতিমুখী হচ্ছে, যা তালপাখার কদর ফিরিয়ে এনেছে। তা সত্ত্বেও কাঁচামালের চড়া দাম এবং পর্যাপ্ত লাভের অভাবে অনেক কারিগর পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এই লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, কারিগরদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বিপণনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্পটি নতুন জীবন লাভ করতে পারে। অন্যথায় বাংলার শতবর্ষী এই সংস্কৃতি কেবল বইয়ের পাতায় বা স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে থাকবে।
বেগম রোকেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শাহনাজ বেগম বলেন, বাংলা লোকসাহিত্যে তালপাতার হাতপাখার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। বিভিন্ন প্রবাদ, গান ও ছড়ায় এই পাখার কথা বারবার উঠে এসেছে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই অংশটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।
ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হাতপাখার প্রচলন দুই সহস্রাব্দেরও বেশি পুরনো। প্রচণ্ড গরমে মায়ের হাতের তালপাখার সেই মৃদু বাতাস আজও বাঙালির আবেগের সঙ্গে মিশে আছে। আধুনিকতার প্রবল স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে এখন সম্মিলিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।