রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪৭ অপরাহ্ন
Title :
মিরসরাইয়ে জনসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তরুণ সমাজসেবক রেজাউল করিম জোরারগঞ্জে অস্ত্র ও মাদকসহ দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেফতার, ৯ মামলার আসামি বোরহান জালে আগুনে পুড়ে যাওয়া ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সতীদাহ মন্দির ব্রড পিক থেকে বিখ্যাত নেপালি পর্বতারোহীর মরদেহ উদ্ধার বাকস্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ জটিল বিষয়: তথ্যমন্ত্রী তরুণ উদ্ভাবকরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ : প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করবে সরকার শ্রীলঙ্কা সফরে যাওয়ার আগে দুঃসংবাদ পেল ভারত সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে রোগীর ঢল, বেড সংকট; দুপুর পর্যন্ত উঠেনি পতাকা নরসিংদীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ২ পক্ষের সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ একজনের মৃত্যু

আগুনে পুড়ে যাওয়া ইতিহাসের নীরব সাক্ষী: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সতীদাহ মন্দির

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ Time View
14

মোঃ মাইন উদ্দিন :

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট গ্রামের এক প্রাচীন মন্দির আজও বহন করে চলেছে ইতিহাসের এক অন্ধকার, নিষ্ঠুর ও বেদনাময় অধ্যায়ের স্মৃতি। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি পরিচিত সতীদাহ মন্দির নামে। এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং নারীর ওপর চালানো এক অমানবিক সামাজিক প্রথার নীরব সাক্ষী।
একসময় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল সতীদাহ প্রথা। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে তার চিতায় জীবন্ত দাহ করা হতো। কোথাও স্বেচ্ছায় সহমরণের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের জোরপূর্বক আগুনে নিক্ষেপ করা হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, অনেক সময় নারীর আর্তনাদ ঢেকে দিতে উচ্চস্বরে ঢাক ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো, যাতে তার বাঁচার আকুতি মানুষের কানে না পৌঁছায়।
অবিভক্ত ত্রিপুরার অন্তর্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্থানে সতীদাহ সংঘটিত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের ধারণা। তবে সেই ইতিহাসের দৃশ্যমান নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে বিদ্যাকুট গ্রামের এই মন্দিরটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে নবীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে, বিদ্যাকুট বাজার-মেরকুটা আঞ্চলিক সড়কের পাশের খালপাড়ে এর অবস্থান।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যাকুটের প্রসিদ্ধ হিন্দু জমিদার পরিবারের সদস্য দেওয়ান রাম মানিক এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাদের পরিবার ভারতে চলে যায়। শুধু বিদ্যাকুট নয়, আশপাশের মেরকুটা, সেমন্তঘর, শিবপুর ও বাঘাউড়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও এই মন্দির ব্যবহার করতেন।
ব্রিটিশ আমলের প্রখ্যাত সাংবাদিক অনিলধন ভট্টাচার্যের রচিত ‘শাশ্বত ত্রিপুরা’ গ্রন্থে এই সতীদাহ মন্দিরের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বিদ্যাকুটকে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের ‘নবদ্বীপ’ বলা হয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাধু-সন্তদের আবাসস্থল হিসেবে গ্রামটির বিশেষ পরিচিতি ছিল।
১৮২৯ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য ও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, আইন হওয়ার পরও কিছু সময় গোপনে এই মন্দিরে সতীদাহের ঘটনা ঘটত।
লোকজ সংস্কৃতি গবেষক জহিরুল ইসলাম চৌধুরী স্বপনের সংগ্রহে থাকা ব্রিটিশ সরকারের একটি ঐতিহাসিক চিঠিতে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজাকে সতীদাহ প্রথা বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানান প্রবীনরা। পরে এই নথি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশাসনিক তথ্য মতে, ১৮৩৫ সালে রাম মানিকের মাকে সর্বশেষ সতীদাহ বরণকারী হিসেবে উল্লেখ করে এখানে একটি শ্বেতপাথরের ফলক স্থাপন করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ফলক ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ওই নারীর পরিচয় আজ আর জানা সম্ভব নয়।
২০২০ সালের দিকে নবীনগর উপজেলা প্রশাসন সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়ে মন্দিরটি কিছুটা সংস্কার করেন। তবে ঐতিহাসিক স্থাপনার আদিরূপ পরিবর্তন হওয়ায় স্থানীয় ইতিহাস-সচেতন মানুষ ও গবেষকদের মধ্যে তখন কিছুটা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিলো, অপরিকল্পিত সংস্কারের ফলে স্থাপনাটির প্রাচীনত্ব ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। চুনের কাম করায় এর শতবর্ষের পুরোনো স্থাপত্যরূপও আর স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল না।
স্থানীয়দের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী আগে বিলুপ্ত হওয়া একটি নিষ্ঠুর সামাজিক প্রথার স্মারক হিসেবে এই মন্দির বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিবে। তাই এর আদিরূপ অক্ষুণ্ণ রেখে আবারও যথাযথ সংরক্ষণ জরুরি।
বিদ্যাকুট গ্রামের প্রবীনদের তথ্য মতে, মন্দির নির্মাণকারী পরিবারের উত্তরসূরিরা বহু আগেই দেশত্যাগ করেছেন। তাদের ভিটেমাটি এখন সরকারের অর্পিত সম্পত্তি হলেও মন্দিরটি এখনও টিকে আছে। একসময় এটি পরগাছায় আচ্ছাদিত ছিল।
তাঁদের ভাষায়, নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না সতীদাহ প্রথা কি ছিল। ইতিহাসের সেই কালো অধ্যায়, নারীর প্রতি বর্বরতা ও বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরতে এই মন্দিরটি আরও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বিদ্যাকুটের এই প্রাচীন মন্দির আজ আর কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্র নয়। এটি ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী- যা মনে করিয়ে দেয়- সমাজের নামে, ধর্মের ব্যাখ্যার নামে কিংবা কুসংস্কারের আড়ালে নারীর ওপর কি ভয়াবহ নির্যাতন একসময় বৈধতা পেয়েছিল। তাই এই স্থাপনাকে শুধু একটি পুরোনো মন্দির হিসেবে নয়, মানবসভ্যতার ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেই টিকে থাকা প্রয়োজন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com