সাপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের আতঙ্ক কাজ করলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে আমাদের দেশে দেখা মেলে এমন সাপের একটি বড় অংশই পুরোপুরি বিষধর নয়। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শতাধিক প্রজাতির সাপ রয়েছে, যার একটি বড় অংশের উপস্থিতি বা আচরণ সম্পর্কে মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান জানিয়েছেন, দেশের মোট সাপের প্রায় ৮০ শতাংশই বিষধর নয় এবং এগুলোর একটি বড় অংশ মানুষের বসতি বা কৃষিজমির আশপাশে বসবাস করে। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক সময় না জেনেই মানুষ এই উপকারী বা নির্বিষ সাপগুলোকে মেরে ফেলে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত দেখা মেলে এমন নির্বিষ সাপের মধ্যে ঢোঁড়া, লাউডগা, কালনাগিনী, ঘরগিন্নী ও পাতি দুধরাজ অন্যতম। এর মধ্যে ঢোঁড়া ও মাইট্যা সাপ মূলত জলাশয় বা পুকুরপারের কাছাকাছি থাকে এবং প্রধানত ব্যাঙ বা ছোট মাছ শিকার করে। অন্যদিকে, গাছপালায় বসবাসকারী লাউডগা, কালনাগিনী এবং বেত আঁচড়া বেশ চটপটে স্বভাবের হলেও মানুষের জন্য বড় কোনো বিপদ ডেকে আনে না। যদিও কালনাগিনী বা লাউডগার মতো সাপের হালকা বিষ থাকতে পারে কিংবা এরা দ্রুত কামড় দিতে পারে, তবে তা মানুষের জীবন সংশয়ের কারণ হয় না। এছাড়া দাঁড়াশ ও ঘরগিন্নীর মতো সাপগুলো ইঁদুর ও টিকটিকি খেয়ে কৃষিকাজে ও গৃহস্থালিতে পরোক্ষভাবে বেশ সহায়তা করে থাকে।
নির্বিষ সাপের পাশাপাশি বাংলাদেশে বেশ কিছু মারাত্মক বিষধর সাপও রয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। দেশের অন্যতম পরিচিত বিষধর সাপ হলো গোখরা, যার মধ্যে পদ্ম গোখরা ও খৈয়া গোখরা সারা দেশেই কমবেশি দেখা যায় এবং এরা বিপদে পড়লে ফণা তুলে আত্মরক্ষা করে। এছাড়া অত্যন্ত বিষধর কালাচ বা কাল কেউটে সাপ মূলত নিশাচর হওয়ায় রাতের বেলা ঘরের আশপাশে বা অন্ধকারের মধ্যে চলাফেরা করার সময় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করে। অধ্যাপক ফরিদ আহসানের মতে, কাল কেউটের বিষ স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে এবং এর দংশনের লক্ষণ অনেক সময় দেরিতে প্রকাশ পাওয়ায় তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
পরিবেশে সাপের উপস্থিতি এবং তাদের বিষাক্ততার মাত্রা নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা, বসতবাড়ির আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ইঁদুর ও ব্যাঙের উপদ্রব কমালে সাপের আনাগোনা প্রাকৃতিকভাবেই কমে আসে। সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে আক্রমণ না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের স্বার্থে নির্বিষ ও বিষধর সাপের পার্থক্য অনুধাবন করা এবং অপ্রয়োজনে সাপ নিধন থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।