মোঃ মাইন উদ্দিন :
জুলাই যোদ্ধা আজমেরী হক বাঁধনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে ইতালির ভেনিসে তাঁর ওপর ডিম নিক্ষেপের দৃশ্য দেখা গেছে। কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারসাজিতে সত্য-মিথ্যার সীমারেখাও অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে ভিডিওটি সত্য কি না, সেটি নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই না করে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
তবে যদি ভিডিওটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তিকে অপমান করার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের বাইরে, একটি বিদেশি ভূখণ্ডে। সেখানে একজন বাংলাদেশির সঙ্গে আরেকজন বাংলাদেশির এমন আচরণ হয়ে থাকলে তার সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তির প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা অতীত কর্মকাণ্ডের প্রতি ক্ষোভ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ কি তাকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে পেলেই অপমান করার অধিকার দেয়? মতের বিরোধিতা কি ব্যক্তির মর্যাদাকে পদদলিত করার লাইসেন্স হতে পারে?
রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক তখনই প্রকাশ পায়, যখন প্রতিপক্ষ আর মানুষ থাকে না- সে হয়ে ওঠে ভয়ংকর। তখন যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় ঘৃণা, সমালোচনার জায়গা নেয় অপমান, আর রাজনৈতিক মতপার্থক্য রূপ নেয় ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায়। এই সংস্কৃতি যদি দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসের মাটিতেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো জাতির জন্যই অশনিসংকেত।
আমাদের মনে রাখা দরকার, বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি কেবল নিজের পরিচয় বহন করেন না, তাঁর আচরণের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশের নামটিও উচ্চারিত হয়। তিনি যেমন তাঁর যোগ্যতা, সততা ও সৌজন্য দিয়ে দেশের সম্মান বাড়াতে পারেন, তেমনি তাঁর কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড কিংবা তাঁকে ঘিরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক ছাপ ফেলতে পারে।
তাই প্রশ্নটা শুধু আজমেরী হক বাঁধনকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর- আমরা কি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করছি, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে? এমন একটি পরিবেশ কি আমরা তৈরি করছি, যেখানে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের বাইরেও তাকে অপমান করাকে কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে দেখতে শুরু করছে?
এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। আজ একজনকে বিদেশের মাটিতে অপমান করা হচ্ছে, কাল হয়তো অন্য কেউ একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। তখন প্রশ্ন উঠবে- আমরা কি আমাদের নাগরিকদের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মর্যাদাটুকু অক্ষুণ্ন থাকবে?
দায়টা তাই একক কোনো ব্যক্তি কিংবা একটি দলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দীর্ঘদিনের বিভাজন, প্রতিহিংসার রাজনীতি, অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবে না দেখার মানসিকতার দিকেও তাকাতে হবে। কারণ ঘৃণার রাজনীতি কখনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকে না। একদিন তা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে, আরেকদিন নিজের সমাজকেই ক্ষতবিক্ষত করে।
তবে এখান থেকেই বাঁধনদের শিক্ষার আছে অনেক। জনপরিসরে থাকা মানুষদের প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি অবস্থান এবং প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে যারা কোনো আন্দোলন, রাজনৈতিক ঘটনা বা সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের পরিচয়কে যুক্ত করেছেন, তাদের আরও বেশি সংযত, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন। কারণ ব্যক্তিগত অবস্থান যখন জনপরিসরে আসে, তখন তার প্রভাবও আর ব্যক্তিগত থাকে না।
একই শিক্ষা আমাদের সবার জন্য। ভিন্নমতকে শত্রুতা না বানিয়ে বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সমালোচনা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, প্রতিবাদ করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে এবং অন্যায়ের জবাব দিতে হবে ন্যায়সংগত উপায়ে। কারণ কারও রাজনৈতিক পরিচয় আমাদের পছন্দ না হলেও তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার অধিকার আমাদের নেই।
বহির্বিশ্বে বাঙালির আত্মসম্মান আসলে কেবল বিদেশিদের আচরণের ওপর নির্ভর করে না, অনেকাংশে নির্ভর করে আমরা একে অপরের সঙ্গে কেমন আচরণ করি তার ওপর। দেশের ভেতরে যদি আমরা পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখাতে না শিখি, তাহলে বিদেশের মাটিতে গিয়ে জাতীয় মর্যাদার কথা বলা কতটা অর্থবহ?
রাজনীতি থাকবে, মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক থাকবে- এটাই গণতন্ত্র এবং এর সৌন্দর্য। কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন ঘৃণায় পরিণত না হয়, প্রতিবাদ যেন অপমানের ভাষা না নেয়, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন মানবিক মর্যাদাকে গ্রাস না করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা যে মতেরই হই, যে দলেরই হই, কিংবা যে পরিচয়ই বহন করি না কেন- বিশ্বের কাছে আমাদের একটি পরিচয়ই সবচেয়ে বড়, আমরা বাংলাদেশি।
আর সেই বাংলাদেশি পরিচয়ের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।