নতুন কারো সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে একসময় বন্ধু বা পরিচিতজনরাই মূল ভূমিকা পালন করতেন, যার জায়গা পরে দখল করে নেয় বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপ। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনে ছবি দেখে পছন্দ করা, বারবার একই ধরনের কথোপকথন চালানো এবং হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এই ডিজিটাল ক্লান্তি থেকেই বর্তমানে সঙ্গী খোঁজার নতুন একটি সামাজিক ধারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যা ‘পিচ-এ-ফ্রেন্ড’ নামে পরিচিত। এই আয়োজনে কেউ নিজের জন্য একা মঞ্চে দাঁড়ান না, বরং তার কোনো বন্ধু কয়েক মিনিটের একটি ছোট উপস্থাপনার মাধ্যমে তাকে অন্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ফলে অনলাইনের কৃত্রিমতার বাইরে এসে মানুষের ব্যক্তিত্ব ও স্বভাব সরাসরি জানার একটি স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি হয়।
এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে বন্ধুরাই মূলত উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন এবং প্রার্থীর ভালো গুণগুলো সবার সামনে তুলে ধরেন। বন্ধু বলতে পারেন মানুষটি কেমন স্বভাবের, কী করতে ভালোবাসেন বা কোন বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেন। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ মিনিটের এমন উপস্থাপনার পর উপস্থিত সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ পান, যা প্রচলিত ডেটিংয়ের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরে এই ধরনের আয়োজন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, যেখানে বার বা সামাজিক আড্ডার জায়গায় মানুষ অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে অংশগ্রহণকারীদের ওপর সরাসরি পরিচয়ের যে চাপ থাকে, তা অনেকটাই কমে যায় বলে মনে করেন এর সমর্থকেরা।
ডেটিং অ্যাপের প্রতি মানুষের বিরক্তি বাড়ার পেছনেও এই নতুন ট্রেন্ডের জনপ্রিয়তা দারুণভাবে জড়িত। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপগুলোর ব্যবহারকারী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, যা নির্দেশ করে মানুষ এখন অনলাইন পরিচয়ের বাইরে আরও স্বাভাবিক ও অর্থবহ যোগাযোগ খুঁজছে। মনোবিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাপে একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে অনেকের জন্যই বিষয়টি মানسিকভাবে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে পরিবার ও সামাজিক প্রত্যাশা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এই ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই তুলনায় পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে সামনাসামনি পরিচয় হলে পারস্পরিক আস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ অনেক বেশি কাজ করে।
অবশ্য বন্ধুর সুপারিশ মানেই যে সম্পর্ক সফল হবে, বিষয়টি এমন নাও হতে পারে। অনেক সময় বন্ধুর অতিরিক্ত প্রশংসার কারণে অপর পক্ষের মনে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে, যার সঙ্গে বাস্তব মানুষটির মিল নাও থাকতে পারে। আবার পরিচয় সফল না হলে বন্ধুরাও কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। তাই মনোবিশেষজ্ঞরা এটিকে কোনো সম্পর্কের চূড়ান্ত পরীক্ষা না ভেবে বরং কথোপকথন শুরুর একটি মাধ্যম হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত একটি সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি নির্ভর করে পারস্পরিক সম্মান, খোলামেলা যোগাযোগ এবং সময় নিয়ে একে অপরকে বোঝার ওপর।
এমনকি কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের সন্ধান না মিললেও এই ধরনের সামাজিক আয়োজন মানুষের একাকিত্ব দূর করতে এবং নতুন বন্ধু তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে বন্ধু বা পরিচিতদের মাধ্যমে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়, তবে বর্তমান সময়ে এটি আরও আধুনিক রূপ লাভ করেছে। প্রযুক্তির বিস্তার পরিচয়ের ক্ষেত্র বাড়ালেও কাউকে সত্যিকার অর্থে জানার জন্য এখনো সরাসরি মানুষের উপস্থিতি ও সময় দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ‘পিচ-এ-ফ্রেন্ড’-এর আসল আকর্ষণ মূলত এখানেই, যেখানে মানুষ কেবল একটি অনলাইন প্রোফাইল দিয়ে কাউকে বিচার না করে আরও মানবিক ও স্বাভাবিক উপায়ে একে অপরের কাছাকাছি আসার সুযোগ পাচ্ছেন।