সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই লালমনিরহাটে দেখা দিয়েছে তীব্র সার সংকট। পাশাপাশি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রিরও জোরালো অভিযোগ উঠেছে। এই কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুতদারির প্রতিবাদে লালমনিরহাট-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকরা।
রোববার সকালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর বাফা গোডাউনের সামনে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। এর ফলে কিছু সময়ের জন্য ওই সড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরবর্তীতে দ্রুত সার সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসে কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন।
এর আগে গত ১০ আগস্ট একই দাবিতে জেলার কালীগঞ্জে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন কয়েক হাজার কৃষক।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সারের চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দ বেশ কম। ইউরিয়া সারের চাহিদা ৬৮,৯৩২ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে মাত্র ৩৯,৬৯০ টন। একইভাবে ৩০,২১০ টন টিএসপি সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১২,৭০২ টন। ডিএপি ও এমওপি সারেও একই ঘাটতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে টিএসপি সারের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে ‘স্টক শেষ’ অজুহাত দেওয়া হলেও বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ৪০০ থেকে ৮৫০ টাকা প্রদান করলে ঠিকই সার পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি নির্ধারিত ১,৩৫০ টাকা দামের টিএসপি সার কোথাও কোথাও ১,৬০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাড়তি দাম নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে ডিলাররা কোনো ক্যাশ মেমো দিচ্ছেন না।
ভুক্তভোগী কৃষক রেজাউল আলম বলেন, “ডিলার ও ব্যবসায়ীরা সার নেই বলে আমাদের ফিরিয়ে দেন, অথচ অতিরিক্ত টাকা দিলেই সেই সার ঠিকই বের হয়ে আসে। এতে আমাদের ফসলের উৎপাদন খরচ বহুলাংশে বেড়ে যাচ্ছে।”
তবে বিএডিসির লালমনিরহাট গুদামের সহকারী পরিচালক একরামুল হক দাবি করেছেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী গুদামে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে এবং নির্ধারিত ১৪৪ জন ডিলারের মাধ্যমেই সঠিক মূল্যে তা বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় ডিলারদের দাবি, বরাদ্দ কম হওয়ায় সবার চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তবে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুত রুখতে বাজার মনিটরিং ও ডিলার পয়েন্টগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা অবৈধ মজুতের সত্যতা পেলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে আমন মৌসুমে লালমনিরহাটে নিয়মিতভাবে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। উপজেলাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট চাহিদা, প্রকৃত বরাদ্দ এবং বিক্রয়মূল্যের সরকারি তথ্য উন্মুক্ত না থাকায় ঘাটতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না। আমনের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না 되면 বড় ধরনের ফলন বিপর্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা।