মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং অতীতে সংঘটিত নৃশংসতার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা (ইউসিআর)।
গত রোববার কক্সবাজার থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিবৃতিতে তারা নিজেদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন পরিচয় দিয়ে এ দাবি জানায়। তারা মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ আগস্টের বিবৃতিকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ইতিহাস পুনর্লিখনের ‘পরিকল্পিত প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে।
ইউসিআরের ভাষ্য, মিয়ানমার সরকার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত অপরাধ আড়াল করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জবাবদিহির আহ্বান এড়িয়ে যেতে চাইছে। ‘বাঙালি’ শব্দটি রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুছে ফেলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বহু শতাব্দী ধরে বিস্তৃত। মিয়ানমার সরকারও অতীতে রোহিঙ্গাদের দেশটির আদিবাসী জাতিগত সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
বিবৃতিতে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে ইউসিআর বলেছে, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের দুর্দশার জন্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (আরসা) দায়ী করে বাস্তবতা উল্টে দিচ্ছে। তাতমাদাওয়ের (মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দপ্তরিক নাম) ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ ছিল গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূলের একটি পদ্ধতিগত অভিযান। এ সময় নারীদের ব্যাপক হারে ধর্ষণ, ৩০০টির বেশি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া এবং পুরো পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনা ঘটে। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে।
ইউসিআর বলছে, মিয়ানমারের হিসাবে ৫ লাখ ৪০ হাজার ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তবে ২০১৭ সালের অভিযানের সময় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর সঙ্গে ১৯৯১-৯২ সালের নিপীড়নের সময় পালিয়ে আসা আরও ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা যুক্ত হয়। রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে ২ লাখের বেশি মানুষ বসবাস করছে– মিয়ানমারের এমন দাবিও বিভ্রান্তিকর। রাখাইনে থাকা এসব মানুষের বড় অংশ কার্যত শিবিরে আটক অবস্থায় রয়েছে। তাদের চলাচলের স্বাধীনতা নেই এবং তারা মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের হিসাবে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার পরিচালিত যাচাই প্রক্রিয়াকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়ে ইউসিআর বলছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে নিবন্ধনের শর্ত আরোপ করে তাদের জাতিগত পরিচয় ও ঐতিহ্য অস্বীকার করতে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে মিয়ানমার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০-এর বেশি নাম ‘যাচাইযোগ্য নয়’ বলে চিহ্নিত করেছে। এ প্রসঙ্গে ইউসিআর বলছে, রোহিঙ্গাদের গ্রহণ এবং তাদের জাতিগত পরিচয় স্বীকার করতে মিয়ানমারের অনীহার কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টিও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। তারা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রক্রিয়া পরিচালনার দাবি জানিয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে দেখানোর বিরোধিতা করেছে ইউসিআর। সংগঠনটির ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন কোনো কূটনৈতিক বিরোধ নয়। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিষয়। এ অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা হয়েছে।
মিয়ানমার বলেছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের গ্রহণ করা হবে। তবে ইউসিআরের দাবি, তাতমাদাও যতদিন রাখাইনে ‘দখলদার শক্তি’ হিসেবে থাকবে, ততদিন সেখানে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি হবে না। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই নিপীড়নের মূল অপরাধী। রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী যেখানে রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে, সেখানে তারা ফিরে যেতে প্রস্তুত নয়।