মোঃ মাইন উদ্দিন :
সাংবাদিকতার সুবাদে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল ও জনসমাগমে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে অনেকবার। কখনও মঞ্চের কাছাকাছি, কখনওবা দর্শক সারিতে বসে শুনেছি অসংখ্য বক্তার বক্তব্য। দীর্ঘদিনের এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় আমি বুঝেছি- মঞ্চের কাছে থাকলে মূলত বক্তার বক্তব্য শোনা যায়, কিন্তু দর্শক সারিতে বসলে অনেক সময় সেই বক্তব্যের বাইরের বাস্তবতাও জানা যায়। কারণ, দর্শকদের আলোচনায় সমাজের অনেক অজানা, অপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ সত্য উঠে আসে।
সম্প্রতি একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে গিয়ে প্রায় ছয় বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। সম্ভবত ২০২০ সালের কথা। সেদিন সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি মাদকবিরোধী সমাবেশে গিয়েছিলাম। মঞ্চের কাছে না গিয়ে দর্শক সারিতে বসে মানুষের কথাবার্তা শুনছিলাম। সেখানে কয়েকজন আলোচনা করছিলেন, এলাকার মাদকসেবী এবং মাদক বেচাকেনায় সহায়তাকারী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি মঞ্চে নেতৃবৃন্দ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বসে আছেন। শুধু তাই নয়, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বক্তব্যও দিয়েছেন।
মানুষের আলোচনায় বিষয়টি এতটাই স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল যে, একজন সাংবাদিক হিসেবে তা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিলাম। শিরোনাম ছিল- “মাদকবিরোধী সমাবেশের মঞ্চে এবং বক্তব্যে এলাকার এক চিহ্নিত মাদকসেবী”। আজও আমার মনে আছে, সংবাদটি প্রকাশের পর তা মুছে ফেলার জন্য আমাকে নানা ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল।
পুরোনো সেই ঘটনার কথা মনে পড়তেই একটি প্রশ্ন আবার সামনে আসছে- সত্য লিখলে যদি সাংবাদিককে চাপের মুখে পড়তে হয়, কিংবা চাপের কারণে সত্য লিখতেই না পারে, তাহলে সাংবাদিকতার অর্থ কী? মানুষ সাংবাদিকদের কাছ থেকেই সত্য ও সঠিক তথ্য জানতে চায়। কিন্তু সাংবাদিকতা যদি প্রভাবশালীদের মন রক্ষা, ভয় কিংবা চাপের কাছে নত হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের সত্য জানার অধিকার কোথায় দাঁড়াবে?
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন- কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আঘাত করা বা হেয় করার উদ্দেশ্যে এই লেখা নয়। প্রশ্নটি সামাজিক দায়বদ্ধতার। মাদকবিরোধী সমাবেশ নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ। কিন্তু এমন একটি মহৎ আয়োজনের মঞ্চে যদি এমন কেউ উপস্থিত থাকেন, যাঁকে সমাজে মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মানুষ চেনে বা আলোচনা করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য হবে? আর সেই বিতর্কের কারণে পুরো আয়োজনের উদ্দেশ্যই বা কতটা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য থাকবে?
মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলার সময় এসেছে, এবং কথা বলতেই হবে। তাই মাদকবিরোধী সমাবেশ অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। কিন্তু শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিজে, নিজের পরিবার, সন্তান-স্বজন এবং আশপাশের মানুষকে মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করাও সামাজিক দায়িত্বের অংশ। কাজেই কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলে মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হবেই। কারণ মানুষ শুধু বক্তার কথা শোনে না, তাঁর কাজ ও বাস্তব অবস্থানও বিবেচনা করে।
বর্তমান সময়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কোনো বিষয় দীর্ঘদিন গোপন রাখা সহজ নয়। দর্শক সারিতে বসা মানুষ নিজেদের দেখা, জানা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আলোচনা করেন। তাই মঞ্চের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো অসঙ্গতি থাকলে সেটিও দ্রুত মানুষের আলোচনায় চলে আসে। এতে শুধু কোনো ব্যক্তি নয়, পুরো আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তাই মাদকবিরোধী সমাবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে কারা মঞ্চে থাকবেন, কারা বক্তব্য দেবেন এবং সমাজে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু- এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি ভালো উদ্যোগকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা এবং তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত আয়োজকদেরই।
জানি না, আজকের এই লেখার জন্যও আবার কোনো চাপের মুখে পড়তে হবে কি না। তবে চাপের আশঙ্কায় সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সাংবাদিকতায় নেই। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নামে কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেয় করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করে, বাস্তবতা বুঝে এবং প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরা।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি সত্য। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা সাংবাদিকতা- সব ক্ষেত্রেই কথার সঙ্গে কাজের মিল এবং দায়িত্বশীল আচরণ মানুষের আস্থা তৈরি করে।
সত্য কখনও অস্বস্তিকর হতে পারে, কারও কাছে অপছন্দনীয়ও হতে পারে। কিন্তু সত্যকে আড়াল করে কখনও স্থায়ী বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা যায় না। কারণ, দিন শেষ সত্যই সাংবাদিকতা ও সংবাদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।