দেশের কম্পিউটার বাজারের চিত্র বর্তমানে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, যেখানে বিগত এক বছরের ব্যবধানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন কম্পিউটার ক্রয়, পুরোনো সিস্টেম আপডেট কিংবা গেমিং ও গ্রাফিকসের মতো ভারী কাজের জন্য উচ্চক্ষমতার ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ তৈরির ক্ষেত্রে ক্রেতাদের এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে চারগুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে র্যাম, এসএসডি এবং গ্রাফিকস কার্ডের মতো মেমোরি ও প্রসেসিং ইউনিটগুলোর দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ ক্রেতা ও প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পুরো কম্পিউটার সেটআপের সামগ্রিক খরচ বহুলাংশে বেড়ে গেছে। ফলস্বরূপ, সীমিত বাজেটের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত কনফিগারেশন পাওয়া এখন ক্রেতাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সব ধরনের যন্ত্রাংশের দাম সমানভাবে না বাড়লেও মেমোরি চিপনির্ভর পণ্যগুলোতে মূল্যবৃদ্ধির ঝাঁঝ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। পাইকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে যে ডিডিআর-৪ আট জিবি র্যাম দুই হাজার একশ টাকায় পাওয়া যেত, তা বর্তমানে বেড়ে আট হাজার টাকায় ঠেকেছে। একইভাবে ডিডিআর-৫ ষোল জিবি র্যামের দাম সাত হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় সাতাশ থেকে বত্রিশ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি, এনভিএমই এসএসডি এবং এক টেরাবাইট স্টোরেজ ডিভাইসের দামও প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রসেসর ও মাদারবোর্ডের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যেখানে কোর আই-ফাইভ কিংবা কোর আই-থ্রি প্রজন্মের প্রসেসর কিনতে ক্রেতাদের অতিরিক্ত পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। এছাড়া কিছু আধুনিক মডেলের আট জিবি গ্রাফিকস কার্ডের দাম লাখ টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ায় গেমিং বা থ্রিডি ডিজাইনিংয়ের বাজার একপ্রকার থমকে গেছে।
প্রযুক্তিবাজারের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের পেছনে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসারকে মূল কারণ হিসেবে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মেমোরি চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ের ডিডিআর-ফোর বা ডিডিআর-ফাইফ র্যামের উৎপাদন কমিয়ে বর্তমানে লাভজনক হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি বা এন্টারপ্রাইজ এসএসডি তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারেই সাধারণ কম্পিউটারের যন্ত্রাংশের সরবরাহ কমে গেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর বাজারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের ঊর্ধ্বমুখী বিনিময় হার, উচ্চ আমদানি শুল্ক, পরিবহন ব্যয় এবং স্থানীয় বাজারে কিছু প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বজুড়ে ডেটাসেন্টার ও ক্লাউড সার্ভারের জন্য বিপুল পরিমাণ স্টোরেজের চাহিদা তৈরি হওয়ায় সাধারণ খুচরা বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের এই মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
যন্ত্রাংশের এমন লাগামছাড়া দামের কারণে দেশের শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার, গেমার এবং সাধারণ অফিস ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। নির্দিষ্ট বাজেট নিয়ে বাজারে আসা ক্রেতারা আর আগের মতো ভালো কনফিগারেশনের কম্পিউটার কিনতে পারছেন না এবং অনেকে বাধ্য হয়ে কম ক্ষমতার যন্ত্রাংশ কিনছেন কিংবা ক্রয়ের পরিকল্পনা স্থগিত রাখছেন। অনেক ক্রেতা আবার আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং প্রকৃত খরচের হিসাব সাধারণের সামনে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে, কম্পিউটারের বাজারদর বর্তমানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের আইটি সেক্টর ও ফ্রিল্যান্সিং খাত বড় ধরনের স্থবিরতার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।