যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পার হয়েছে। তবে তেহরানের সরকারের পতন কিংবা ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র বিজয়– কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ শুরুর পর মার্কিন প্রশাসনের আশা ছিল দেশটির সরকারে বড় পরিবর্তন আনা যাবে। তবে ছয় মাস পর স্পষ্ট, সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। উল্টো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর পর যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা কমলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। বরং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আঞ্চলিক জোট পুনর্গঠন শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা এই অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক সানাম ওয়াকিল জানান, উপসাগরীয় দেশগুলো বহু আগে থেকেই তাদের অর্থনীতি বহুমুখী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ইরান যুদ্ধ কেবল সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রাজস্বকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করায় সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গালফ রিসার্চ সেন্টারের অর্থনীতিবিদ জন স্ফাকিয়ানাকিস জানান, তেল রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও লাফিয়ে বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে টিকে থাকার পথ খুঁজছে।
শর্তের তালিকা প্রস্তুত করছে তেহরান
সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি এ ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখছেন। ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসিন রেজাই জানিয়েছেন, ওমান ও ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে একটি সাময়িক শিপিং করিডোর তৈরির বিষয়ে ওমানের সঙ্গে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয়, হরমুজ প্রণালি এখনই খুলে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে তেহরান তাদের শর্তের তালিকা প্রস্তুত করছে। এর মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধ করা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেহরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত চাপের নীতি ত্যাগ করে, তবেই কূটনৈতিক পথ ফের উন্মুক্ত হতে পারে। ওমান ও কাতারের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, জুনের স্মারক অনুযায়ী মার্কিন অবরোধ না উঠলে হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে।
অদৃশ্য নেতৃত্বের ছয় মাস: কোথায় মোজতবা খামেনি?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তাতে আহত হন মোজতবা খামেনি। এর পর দেশটিতে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসা সত্ত্বেও সাধারণ ইরানিরা তাঁকে একনজর দেখতে পাননি বা তাঁর কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাননি।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কঠিন এই মুহূর্তে তেহরানকে একের পর এক কঠিন সব নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা এবং দেশ পরিচালনায় তাঁর প্রকৃত ভূমিকা কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
ইরানি কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো জানাচ্ছে, খামেনি নিরাপত্তার কারণে আড়ালে থেকেই দেশ পরিচালনা করছেন এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ওপর দৈনিক প্রশাসনিক দায়িত্ব সঁপে দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাটানকা বলেন, ‘প্রশ্ন এখন আর এটি নয়, মোজতবা বেঁচে আছেন কিনা? বরং প্রশ্ন হলো, ইরানে আদৌ কি কোনো সক্রিয় সর্বোচ্চ নেতা আছেন?’