জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ড. খলিলুর রহমান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। বর্তমান বিশ্বে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে এক ধরণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবের কারণে বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্জনগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি উত্তরণে জাতিসংঘকে কেবল রক্ষাই নয়, বরং এটিকে আরও গতিশীল ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। নতুন এই অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে—আস্থা পুনরুদ্ধার ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সবার জন্য একটি কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা। তার মতে, কেবল ফাঁকা বুলি বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জাতিসংঘের হারানো গৌরব বা আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়; বরং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এনে এই আস্থা অর্জন করতে হবে।
নিজের দায়িত্বের প্রথম বছরে বৈশ্বিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মোট ছয়টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন নতুন সভাপতি। প্রথমত, শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে সংঘাত প্রতিরোধ, রাজনৈতিক সমাধান এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি। এক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষী পাঠানোর ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, দুই লাখের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর অবদান বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিদ্যমান ব্যবধান কমানো এবং উন্নয়ন অর্থায়নের সংকট দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের সময়সীমা ফুরিয়ে আসলেও অর্ধেকের বেশি লক্ষ্য এখনো পিছিয়ে রয়েছে, যা উত্তরণে আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর আলোকপাত করে তিনি আসন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের আগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা তহবিল কার্যকর করার তাগিদ দেন। চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবাধিকার রক্ষা এবং তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার বিষয়টিকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অগ্রাধিকার হিসেবে যথাক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ও বৈষম্যহীন ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বিশ্ববাসীর আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার রূপরেখা তুলে ধরেন তিনি।
ড. খলিলুর রহমানের এই প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কয়েকটি বিষয় জোরালোভাবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা সংকট, যা তিনি বিশ্ববাসীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মঞ্চে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ যেভাবে মানবিক কারণে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কাঠামোর সংস্কারসংক্রান্ত তার অবস্থান বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও তহবিল গঠনে তার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ সংকট নিরসন এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তার বক্তব্যে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
জাতিসংঘের প্রশাসনিক সংস্কার এবং কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছেন সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি। তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে কোনো ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই নির্ধারিত চাঁদা যথাসময়ে পরিশোধ করার জোরালো আহ্বান জানান। জাতিসংঘের প্রতিটি অর্থের যথাযথ, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই তহবিল কেবল ধনী দেশগুলোর নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের তরুণ সমাজকে আরও বড় পরিসরে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি। নিজের কার্যালয়ের কার্যক্রমে ভৌগোলিক ভারসাম্য ও লিঙ্গসমতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি জানান যে, তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী, যা আন্তর্জাতিক সংস্থায় নারী নেতৃত্বের সফলতার একটি বড় উদাহরণ। শেষ পর্যন্ত, এই অধিবেশনকে একটি যুগান্তকারী মোড় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বিশ্ববাসীকে নতুন আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান, যাতে আগামী দিনে জাতিসংঘ আরও বেশি কার্যকর ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।