সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি:
জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও খুনাখুনি কমাতে এবং নারীর নায্য অধিকার নিশ্চিত করতে অভিনব ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’ উদ্ভাবন করেছেন ভূমি গবেষক সেলিম মিয়া। তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমি নিয়ে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও আইনি জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার এই প্রযুক্তিভিত্তিক কার্ড চালু হলে ভূমি নিয়ে জালিয়াতি ও জবরদখলের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।
উচ্চমাধ্যমিক পাস করা সেলিম মিয়ার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামে। ১৯৯৫ সালে তিস্তার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন পেশার পর আদালতের মামলার এজাহার লেখার কাজ শুরু করেন তিনি। এ সময় তিনি লক্ষ্য করেন, আদালতে আসা অধিকাংশ মামলাই জমিজমা সংক্রান্ত। এই ভাবনা থেকেই তিনি শুরু করেন ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের উপায় খোঁজার কাজ এবং গড়ে তোলেন নিজস্ব ‘ভূমি গবেষণাগার ও তথ্য ভাণ্ডার’।
সেলিমের গবেষণাগারে গিয়ে দেখা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ভূমি নিয়ে সংঘর্ষ, হতাহত, অগ্নিসংযোগ, জাল দলিল ও জবরদখলের হাজার হাজার খবরের কাটিং ঘরের চার দেয়ালে আঠা দিয়ে সেঁটে রেখেছেন তিনি। তার দীর্ঘ ১৩ বছরের সংগ্রহ ও হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে দেশে ভূমি বিরোধের জেরে ২৪০২ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রংপুর বিভাগে ৪৭৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪ জন, খুলনা বিভাগে ২৩৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১৮ জন, ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭ জন, সিলেট বিভাগে ১৮৬ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন।
সেলিম মিয়ার প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’ ব্যবস্থায় প্রতিটি ভূমি মালিকের নামে একটি নির্দিষ্ট কার্ড থাকবে। এতে মালিকের মোট জমির পরিমাণ, মৃত্যুর তারিখ, ওয়ারিশদের তালিকা এবং যেকোনো কেনাবেচার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হবে। জমি কিনলে পরিমাণ যোগ এবং বিক্রি হলে তা বিয়োগ হবে। এর ফলে খুব সহজেই একজন ব্যক্তির জমির সঠিক পরিমাণ ও মালিকানা যাচাই করা সম্ভব হবে।
গবেষক সেলিমের বিশ্বাস, সরকারিভাবে এই ডিজিটাল ভূমি কার্ড বাস্তবায়ন করা গেলে কেউ জোরপূর্বক অন্যের জমি দখল করতে পারবে না এবং ওয়ারিশদের হিস্যা নিয়ে জটিলতাও দূর হবে। ‘জোর যার মুলুক তার’ বা ‘লাঠি যার জমি তার’—এই নীতি ও মানসিকতার অবসান ঘটিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে তার এই গবেষণা এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।