মোঃ মাইন উদ্দিন :
রাস্তায় চলাচলের সময় উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করেছিল ষষ্ঠ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী। সেই প্রতিবাদের জেরে দিনের আলোয় তার বাড়িতে ঢুকে তাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যরা বাধা দিতে গেলে তাঁদেরও ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হামলার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ঘটনাটি বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের মাধবদী গ্রামে ঘটেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ছয়সূতী ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। এ ঘটনায় তার বোন বাদী হয়ে কুলিয়ারচর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
ঘটনার বিবরণ যতটা উদ্বেগজনক, তার চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো- একজন কিশোরী শিক্ষার্থী যদি রাস্তায় চলাচলের সময় উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করেও নিজ বাড়িতে নিরাপদ না থাকে, তাহলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
একটি শিশুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পথ নিরাপদ থাকবে- এটি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি তার মৌলিক অধিকার। অথচ সেই পথেই যদি তাকে উত্ত্যক্ত করা হয় এবং প্রতিবাদ করার কারণে বাড়িতে গিয়েও হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগের কার্যকারিতার প্রশ্ন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরিবারের সদস্যরা বাধা দেওয়ার পর তাঁদেরও ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু একজন শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা নয়, একই সঙ্গে একটি পরিবারকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয় ও বসবাসের স্থান সম্পর্কেও তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব তথ্য প্রচারের আগে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে অভিযুক্ত। তাই ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
তবে তদন্তের নামে যেন সময়ক্ষেপণ না হয়- সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভুক্তভোগী একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। তার মানসিক নিরাপত্তা, শারীরিক নিরাপত্তা এবং শিক্ষাজীবন- তিনটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার পর সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্কুলে যেতেও ভয় পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে আবার স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এটি আশাব্যঞ্জক। এখন প্রয়োজন সেই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হলেই বিচার হয়ে যায় না। ভিডিও যেমন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে, তেমনি তার সত্যতা, প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করাও জরুরি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা সামাজিক মাধ্যমে বিচারের সংস্কৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশু সাহস করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার পর যদি তার পরিণতি হয় ভয়, মারধর ও নিরাপত্তাহীনতা- তাহলে ভবিষ্যতে অন্য শিশুরা প্রতিবাদ করতে ভয় পাবে। এতে অন্যায়কারীরাই উৎসাহিত হবে।
তাই এই ঘটনার বিচার শুধু একজন শিক্ষার্থীর জন্য নয়, এটি এমন একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ- উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করা অপরাধ নয়, অপরাধ হলো উত্ত্যক্ত করা এবং সেই প্রতিবাদের কারণে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো।
একজন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী যেন নির্ভয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে, নিজের অধিকারের কথা বলতে পারে এবং নিজ বাড়িতেও নিরাপদ থাকতে পারে- এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার দায়িত্ব।