মিসবাহ উদ্দিন আহমদ:
এনসিপির আন্দোলন: সরকার কতটা দায়িত্বশীল?আগামী ৫ আগস্ট ২০২৬ আমরা শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের দুই বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছি। জুলাইয়ের শুরু থেকেই দেশজুড়ে নানা আয়োজন, আলোচনা সভা ও সেমিনারের মাধ্যমে এই গণ-অভ্যুত্থানকে স্মরণ ও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। নিউইয়র্কেও গত ১ই আগস্ট শনিবার এনসিপি তাদের কর্মসূচি পালন করেছে, এবং আগামী ৮ আগস্ট Patriots of Bangladesh জ্যাকসন হাইটসে দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে এ দিবসটি পালন করবে। যে সাহসী ছাত্র-জনতা নিজেদের আত্মত্যাগ ও দৃঢ় অবস্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, এই দিনটি মূলত তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে, আন্দোলনের মূল চেতনা, আদর্শ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গভীর আলোচনা করার পরিবর্তে কিছু আয়োজনে হিংসাত্মক মুহূর্তের উস্কানিমূলক প্রদর্শনী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে আক্রমণাত্মক উপস্থাপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নবগঠিত এনসিপির দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জসহ সিলেট অভিযাত্রায় সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে সৃষ্ট পরিস্থিতি সরকারের ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে—তা সময়ই বলে দেবে।
তবে গণতন্ত্রের মূল চেতনা হলো ভিন্নমত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য একটি সহনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাংবিধানিক অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার শরিকেরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করলেও, ফলাফলে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগে জনমনে উঠেছে যা সাধারণ মানুষের মনে প্রাথমিক অনাস্থার বীজ বুনে দেয়েছিল।
____পাশাপাশি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। জেলা-প্রশাসক সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দলীয় নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে সংসদে ভিতরে বাহিরে, বিভিন্ন সভা সমাবেশ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া আলোচনায় দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত Transparency International Bangladesh (TIB)–এর প্রতিবেদনে মূলত দুর্নীতি ও ঘুষের তথ্য ২০২৬ সালের জাতীয় খানা জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮১.৬% পরিবার কোনো না কোনো সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি বা ঘুষের অভিজ্ঞতার কথা বলেছে।
২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমানে ঘুষ ও দুর্নীতির সামগ্রিক হার ১৫.১% বেড়েছে।
এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে আনুমানিক ১২,৬৩৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপে ১৭টি সেবা খাত বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেমন—পাসপোর্ট, BRTA, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর ও শুল্ক, ব্যাংকিং, স্থানীয় সরকার, NID সেবা ইত্যাদি।
সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিপ্রবণ খাত হিসেবে পাসপোর্ট সেবা ও BRTA-কে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ৬০৫টি খুন এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
_____ইতিহাস সাক্ষী, মেগা প্রজেক্টের কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে দলীয় সিন্ডিকেট—যে অতীত ভুলের জন্য ক্ষমতার বাইরে কাটাতে হয়েছিল দীর্ঘ সময় বিএনপিকে আজ যেন সেই পুরনো পথেই হাঁটতে শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ তিনি প্রতিটি মুহূর্ত সংবিধানের আর্টিকেল নিয়ে কথা বলেন। অথচ সংবিধানে ৩৭ অনুচ্ছেদে”প্রত্যেক নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়ার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় (মিছিলে) অংশগ্রহণ করার অধিকারটির উপর বর্তমান সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের বেশ কিছু ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী ও অন্যতম রূপকার ছাত্রনেতাদের দ্বারা গঠিত দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি’ (এনসিপি)-র সাম্প্রতিক হবিগঞ্জ সভা-সমাবেশে পুলিশ প্রশাসন ও যৌথ বাহিনীর নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ এবং দমন-পীড়ন আজ প্রত্যক্ষ করছে দেশবাসী। যে পুলিশ প্রশাসনকে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের সেবক হিসেবে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই পুলিশকেই আবার বিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠ স্তব্ধ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকারি অঙ্গ-সংগঠনগুলোর হামলা- মার মুখি চিত্র দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।
যে ফ্যাসিবাদী কায়দায় ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনীকে বিরোধী মত দমনে নামানো হতো, ঠিক একই কায়দায় আজ ক্ষমতাসীনদের অঙ্গ-সংগঠনগুলো রাজপথে পেশিশক্তি প্রদর্শন এটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে দেশবাসী প্রত্যাশা করেনি।
বিএনপি’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে যে এন,সি,পির কেন্দ্রীয় নেতারা বিশেষ করে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, সার্জিস আলম, হাসমত আব্দুল্লাহ, নাহিদ ইসলাম সহ বেশ কিছু নেতাকর্মী বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিশ্বাস করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেছে এবং আন্দোলনের নামে অসহংসতার তৎপরতা চালাচ্ছে। দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে তার উন্নয়নের কাজে বাধা দিচ্ছে।
তাছাড়া বিএনপির শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতা এবং বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, “ছাত্ররা আবার রাজনৈতিক দল কেন করবে?” তাঁদের দাবি, অভ্যুত্থান সমাপ্তি হওয়ার পর ছাত্রদের নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে যাওয়াই উচিত ছিল।
তবে সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করা নাগরিকদের একটি মৌলিক অধিকার। কে নতুন দল গঠন করবে—সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার সংবিধান কারো দেয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা চব্বিশের বিপ্লবের মতো সব বড় আন্দোলনে ছাত্ররা রক্ত দিয়ে আনা ফসলের শস্য রাজনীতিবিদরা ভোগ করেছে। আজ জুলাইয়ের অভ্যস্তানের ছাত্রদের একটি অংশ নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করাটাকে প্রাপ্তি ও অংশীদারিত্বের চ্যালেঞ্জের মনে করছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে ক্ষমতায় আসার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ভারতের তামিলনাড়ুর অভিনেতা সি. জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়)-এর নেতৃত্বাধীন Tamilaga Vettri Kazhagam (TVK)।
দলটি ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশগ্রহণ করে দলটি ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে এককভাবে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দলের সমর্থনে সরকার গঠন করে।
এন,সি,পি একটি নতুন রাজনৈতিক দল—তাই বলে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সরকারদলীয় নেতাকর্মী কিংবা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কতটা গ্রহণযোগ্য?
এনসিপিকে তাদের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ দিলে সরকারেরই এমন কী ক্ষতি হতো?
___সংবাদপত্রের স্বাধীন বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের আলোকে আজ দেশের সাধারণ মানুষের মুখে আর একটিই বড় প্রশ্ন— বিএনপি যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলে এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর লড়াই-সংগ্রামের দাবি করেছিল, ক্ষমতার আসনে বসে তারা কি নিজেদের অতীত শিক্ষা এত দ্রুত ভুলে গেল?
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত কোন সরকার যদি অতীতের স্বৈরাচারের অনুসরণ করে, তা কেবল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনই এনে দেয়—গণতন্ত্রের মুক্তি ঘটায় না।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এনসিপির সহ অগণিত তরুণরা জীবন দিয়ে দেশে বাক-স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার ফিরিয়ে এনেছে, কিন্তু আজ এনসিপির উপরে এই জুলুম স্পষ্ট প্রমাণ করে—গণতন্ত্রের আড়ালে বাংলাদেশ আজ এক নতুন রাজপথের সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছিল এর শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র চরিত্র। সশস্ত্র পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদ যেমন সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তেমনি আন্দোলনকারীদের হাতে পানি পৌঁছে দেওয়া মীর মুগ্ধ এই সংগ্রামের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছিলেন। পুলিশের ব্যারিকেড ও তাক করা অস্ত্রের সামনে খালি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য তরুণই ছিল এ আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র।
জুলাইয়ের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে চলমান কর্মসূচিগুলোতে যদি সহিংসতা বা সংঘর্ষকে মহিমান্বিত করা হয়, তবে তা জুলাইয়ের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আজ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে— ক্ষমতার প্রয়োগে তারা অতীতের বিতর্কিত শাসনপদ্ধতির পুনরাবৃত্তি করছে কি না। সরকার জুলাইয়ের আদর্শ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোট অস্বীকার এবং সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন জনগণের প্রত্যাশা ও গণরায় কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেকের আশঙ্কা, বর্তমান সরকার ব্যর্থ হলে দেশ আরও গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে বলে এ আসংখ্য প্রকাশ করছেন।