ইউরোপে পাড়ি জমানোর লোভনীয় আশ্বাসে লিবিয়া থেকে একটি অনিরাপদ রাবারের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়েছিলেন ছয়জন বাংলাদেশি সহ মোট ৩৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই সমুদ্রযাত্রায় নেমে তাদের জীবন প্রায় সংশয়ের মুখে পড়েছিল। পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা ও আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা ছাড়াই উত্তাল সমুদ্রে তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সূত্রপাত করে। দীর্ঘদিন দালালদের গোপন আস্তানায় বন্দি থাকার পর শুরু হওয়া এই বিপজ্জনক অভিযাত্রা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার তৈরি করে।
যাত্রা শুরুর মাত্র ২৮ ঘণ্টার মাথায় অপরিকল্পিত ওই নৌকার তলা ফেটে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে মাঝসমুদ্রে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা জীবন বাঁচাতে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের দেওয়া জরুরি নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায় এবং কেউ কোনো সহায়তা করেনি। দিশেহারা অবস্থায় সাগরে চলাচলকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালান তারা। দীর্ঘ সময় পর ফ্রান্সের ‘থেমিস’ নামক একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের দুর্দশা দেখতে পায় এবং দ্রুত এগিয়ে এসে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করে। পরবর্তীতে উদ্ধারকৃতদের মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বর্তমানে তারা ওই এলাকার একটি অস্থায়ী আটককেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
উদ্ধার হওয়া এই ছয় বাংলাদেশির সবাই নরসিংদী জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা, যারা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে বা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় তারা প্রত্যেকে দালালদের হাতে প্রায় ১৩ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন। জমি বিক্রি কিংবা চড়া সুদে ঋণ করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করেছিলেন তারা। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় বন্দি রাখা হয় এবং সমুদ্রযাত্রার ঠিক আগে দালালদের নিয়ন্ত্রিত একটি নির্দিষ্ট কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল, যা স্থানীয়ভাবে ‘গেম ঘর’ নামে পরিচিত ছিল।
ঘটনার খবর পেয়ে মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট আটককেন্দ্রে গিয়ে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। সেখানে নিজেদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তারা দূতাবাসের সহায়তায় পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে স্বজনদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে খুব দ্রুতই এই ছয় প্রবাসীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।