মোঃ মাইন উদ্দিন :
রাজনীতি মানুষের মতাদর্শের পার্থক্য তৈরি করতে পারে, মতবিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি আন্দোলন-সংগ্রামের পথেও দাঁড় করাতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী, ভিন্নমতের কারণে মানুষ যুগে যুগে প্রতিবাদ করেছে, আন্দোলন করেছে, আবার ভবিষ্যতেও করবে। এটি গণতান্ত্রিক সমাজের একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সেই রাজনৈতিক বিভাজন যখন মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে কারও মৃত্যুর পর আনন্দ প্রকাশে রূপ নেয়, তখন সেটি শুধু রাজনৈতিক অবক্ষয় নয়- এটি আমাদের নৈতিকতা, পারিবারিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধেরও গভীর সংকটের পরিচয় বহন করে।
রাজনীতিতে সরকারবিরোধী এবং সরকারে টিকে থাকার আন্দোলনে যুক্ত- এমন অভিযোগ বা আলোচনা থাকতে পারে। কেউ কারোর মতাদর্শের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার কেউ দ্বিমতও পোষণ করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যুতে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে আনন্দ প্রকাশ করা কোনো সুস্থ সমাজের ভাষা হতে পারে না। কারণ মৃত্যু এমন এক চূড়ান্ত সত্য, যেখানে সকল পরিচয়, ক্ষমতা, মতাদর্শ ও বিরোধ এক মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কবরের নীরবতা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়- দুনিয়ার সব হিসাব একদিন শেষ হবে, আর প্রকৃত বিচার হবে মহান রবের দরবারে।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, কারোর মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির সমাপ্তি নয়, এটি প্রত্যেক পরিবারের কান্না, স্বজনদের শোক এবং প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় বেদনার নাম। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলেও একজন মৃত মানুষকে নিয়ে বিদ্রূপ, কটূক্তি বা আনন্দ প্রকাশ আমাদের মানবিক পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ মানবিকতা তখনই সত্যিকার অর্থে মূল্যবান হয়, যখন তা মতের অমিলের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখায়।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা খুব সহজেই ক্ষণিকের আবেগে এমন কিছু লিখে ফেলি, যা সমাজে ঘৃণা ও বিভাজনের আগুন আরও উসকে দেয়। অথচ আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও পারিবারিক শিক্ষা সবসময় শিখিয়েছে- মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে, তাঁর ভুলত্রুটি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা কামনা করতে এবং শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু কোনো মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো কখনোই সভ্যতার পরিচয় নয়।
রাজনীতি যদি মানুষকে মানবিকতা ভুলিয়ে দেয়, তবে সেই রাজনীতি সমাজকে অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দেয়। মতপার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে, আন্দোলনও থাকবে, কিন্তু মৃত্যুর পর অন্তত মানুষ যেন মানুষকে মানুষ হিসেবেই স্মরণ করতে শেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই পরিণতির যাত্রী।