মোঃ মাইন উদ্দিন :
আজ বিপ্লবী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে তাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে মনে করা নয়, বরং একটি সংগ্রামী ইতিহাসকে নতুন করে সামনে আনা।
মহারাজ নিজেই একবার বলেছিলেন- “আমার পিতার আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল, আমি ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। পড়াশোনার কোনো অভাব ছিল না, খারাপ ছাত্রও ছিলাম না। তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ডিগ্রি নিতে পারিনি।”
এই কথার মধ্যেই যেন তার জীবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার গল্প লুকিয়ে আছে, আরাম-আয়েশের পথ ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রামের পথ।
১৮৮৯ সালের ৫ মে, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কাপাসাটিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। বাবা দুর্গাচরণ চক্রবর্তী এবং মা প্রসন্নময়ী দেবীর ছয় সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার আসল নাম ছিল ত্রৈলোক্য মোহন চক্রবর্তী। ছাত্রজীবনেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণে এক সময় তার নামের “মোহন” বদলে “নাথ” হয়ে যায়। যা পরবর্তীতে ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক সাহসী বিপ্লবী। ১৯০৮ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত জীবনের প্রায় ৩০ বছর কাটিয়েছেন কারাগারে। এর বাইরে আরও কয়েক বছর কাটিয়েছেন আত্মগোপনে। আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলেও তিনি দীর্ঘ ১০ বছর বন্দি ছিলেন। ১৯১৪ সালে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি করে আন্দামানে পাঠানো হয়।
কারাজীবনেও তিনি থেমে থাকেননি। বিভিন্ন সময় তিনি বারিন ঘোষ, পুলিন দাস, পণ্ডিত পরমানন্দসহ অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৫-২৬ সালে ম্যান্ডালে জেলে থাকাকালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গেও তার পরিচয় ও সময় কাটানোর সুযোগ হয়। যা তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
১৯২৮ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি উত্তর ভারতে গিয়ে চন্দ্রশেখর আজাদদের সঙ্গে হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মিতে যোগ দেন। পরে সংগঠনের নির্দেশে বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) গিয়ে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। ১৯২৯ সালে লাহোর কংগ্রেস ও পরে রামগড় কংগ্রেসেও অংশ নেন।
১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং আবারও গ্রেফতার হন। ১৯৪৬ সালে মুক্তি পাওয়ার পর দেশভাগের পরবর্তী সময়ে ঢাকার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী শুধু একজন বিপ্লবীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। সমাজের নানা ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধেও তিনি সরব ছিলেন।
জীবনের শেষ সময়েও তিনি সম্মানিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। ১৯৭০ সালের আগস্টে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে অংশ নেন। এর অল্প সময় পর, ৯ আগস্ট ভোর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দিল্লির ঐতিহাসিক রাজঘাটে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর জীবন আমাদের শেখায়- আসল শিক্ষা শুধু ডিগ্রিতে নয়, আদর্শে এবং কাজে। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার যে বিরল উদাহরণ তিনি রেখে গেছেন, তা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
তার জন্মদিনে এই মহান বিপ্লবীকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।