মোঃ মাইন উদ্দিন :
চাকরির আশায় বিদেশে পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশের তরুণদের গল্প নতুন নয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর পরিবারের স্বপ্ন পূরণের দায় কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন হাজারো যুবক দেশ ছাড়ছেন। কেউ মধ্যপ্রাচ্যে, কেউ ইউরোপে, কেউবা অজানা কোনো গন্তব্যে। কিন্তু সেই স্বপ্নযাত্রা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে শেষ হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের যুবক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসাইনের মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। একটি সাধারণ শ্রমিকের কাজের আশ্বাস দিয়ে বিদেশে পাঠানো হলেও পরে তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়- এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে এটি কেবল প্রতারণা নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, জাহাঙ্গীর একা নন। একই ঘটনায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি বড় চক্রের ইঙ্গিত বহন করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের পাঠানো এবং পরে তাঁদের জোরপূর্বক সামরিক কাজে যুক্ত করা- আন্তর্জাতিকভাবে এটি মানব পাচারের শামিল।
আজকের তরুণেরা বিদেশে যেতে চায় মূলত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত, আর দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির স্বপ্ন অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় অসাধু দালাল ও ভুয়া এজেন্সিগুলো। তারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে চাকরির স্বপ্ন দেখায়, অথচ বাস্তবে অনেককে পাঠিয়ে দেয় অনিশ্চিত জীবন কিংবা মৃত্যুর মুখে।
জাহাঙ্গীরের পরিবার জানিয়েছে, তাঁর বাবা দুই বছর আগে মারা গেছেন। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই ছিল। স্ত্রী ও দুই বছরের সন্তানকে ভালো ভবিষ্যৎ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই হয়তো তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ রক্তাক্ত এক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনা আমাদের রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও প্রবাসী কর্মী ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করা এবং যুদ্ধপ্রবণ দেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে কঠিন নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শুধু শোক প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, দায়ীদের আইনের আওতায় আনাও জরুরি।
একই সঙ্গে সমাজকেও সচেতন হতে হবে। বিদেশ মানেই স্বপ্নপূরণ নয়, এই বাস্তবতা তরুণদের বুঝতে হবে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো এজেন্সির প্রলোভনে পা দিলে তা জীবননাশের কারণ হতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ হয়তো দুই রাষ্ট্রের ক্ষমতার লড়াই, কিন্তু সেই যুদ্ধে প্রাণ হারাচ্ছেন বাংলাদেশের মতো দেশের দরিদ্র ও স্বপ্নবাজ তরুণেরা। বিশ্ব রাজনীতির এই নির্মম খেলায় তাদের জীবন যেন হয়ে উঠছে সবচেয়ে সস্তা মূল্য।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবিক বিবেকের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা।