সামান্য বৃষ্টি হলেই চিন্তার শেষ নেই। রাত জেগে সারারাত বসে থাকতে হতো ভাঙা ঘরে। পুরাতন টিন ও প্লাস্টিক দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া জরাজীর্ণ ঘর। ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার ঘরে রাত কাটাতে হতো।
এমন মানবেতর জীবন থেকে এবার নতুন ঘরে উঠেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ৮৩ বছরের কিরণ হাজং ও তার স্ত্রী পিকলা হাজং (৭৮)।
তাদের জন্য নতুন বসত ঘরটি উপহার দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে অসহায় এই দম্পতির হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেওয়া হয়।
উপজেলার ২ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের বাসিন্দা কিরণ হাজং বার্ধক্যের কারণে তেমন চোখে দেখতে পান না। চলাফেরার জন্য অন্যের সহায়তা নিতে হতো। স্ত্রী পিকলা হাজংও বয়সজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাদের কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। স্থানীয়দের সহযোগিতায় কোনোভাবে চলে তাদের জীবন। এক সময় মানুষের জমিতে ধান কাটার পাশাপাশি শুঁটকি মাছ বিক্রি ও দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন কিরণ হাজং। বয়সের ভারে এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। দীর্ঘদিন ধরে বয়স্ক ভাতার জন্য চেষ্টা করেও তা পাননি বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
কিরণ হাজং বলেন, আগে মানুষের জমিতে কাজ করতাম। এখন শরীরে আর শক্তি নেই, চোখেও ঠিকমতো দেখি না। বয়স্ক ভাতা পেলে অন্তত দুবেলা ভালোভাবে খেতে পারতাম। আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল একটি নিরাপদ ঘর। নতুন ঘর পেয়ে আমরা খুব খুশি। ব্যারিস্টার কায়সার কামালের কাছে আমি চিরঋণী হয়ে থাকব। ব্যারিস্টার কায়সার কামালের জন্য আমরা দোয়া করি, তিনি যেন দীর্ঘজীবী হোন।
এর আগে তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিউজ হয়েছিল। এ খবর দৃষ্টিগোচর হয় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের। পরবর্তীতে তার নিজস্ব টিম দিয়ে সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে খোঁজ নেন এবং নতুন ঘর উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। বৃদ্ধ দম্পতির জন্য নির্মিত নতুন ঘরটি তৈরির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন লেংগুড়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিলন মিয়া।
হাজং দম্পতিকে নতুন ঘর বুঝিয়ে দেওয়ার সময় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল উদ্দিন মাস্টার, কিরণ হাজং ও তার স্ত্রী পিকলা হাজং উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন- ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক, সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, কুল্লাগড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, সংরক্ষিত নারী সদস্য রিতা নকরেক, স্থানীয় স্কুলশিক্ষার্থীসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
কিরণ হাজং ও পিকলা হাজং দম্পতি নিজেরাই ফিতা কেটে নতুন ঘরের উদ্বোধন করেন। পরে তারা উপস্থিত সবাইকে নিয়ে নতুন ঘরে প্রবেশ করেন। দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ঘর ছেড়ে নতুন ঘরে প্রবেশের সময় তাদের মধ্যে আনন্দ ও আবেগের অনুভূতি বিরাজ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা জিতেন্দ্র হাজং বলেন, কিরণ হাজং ও পিকলা হাজং দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামে বসবাস করছেন। আগে তারা কাজ করতে পারতেন। এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন। চোখেও কম দেখেন। ফলে কোনো কাজ করতে পারেন না। সন্তানরা থাকলেও তারাও আর্থিকভাবে অসচ্ছল। বৃষ্টি হলেই সারারাত বসে থাকত। সংসারের সব কিছু ভিজে যেত। এই দুর্দশা থেকে মুক্তি করে দিলেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
দুর্গাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক বলেন, কিরণ হাজং বয়স্ক ভাতার জন্য চার বছর আগে আবেদন করেও ভাতা পাননি। সাংবাদিকরা তাদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার পর বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা হয়েছে। এখন নতুন ঘর পাওয়ায় তারা অন্তত নিরাপদে থাকতে পারবেন। তবে তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দুর্গাপুর ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রিতা নকরেক বলেন, আমি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি, তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে বসবাস করছিলেন। ঘরটি জরাজীর্ণ ছিল এবং বিদ্যুৎ সংযোগও ছিল না। নতুন ঘর পাওয়ায় তারা এখন কিছুটা স্বস্তি পাবেন।
এলাকাবাসী জানান, আমরা ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে অসহায় এই বৃদ্ধ দম্পতির দীর্ঘদিনের দুর্দশার অবসানে নতুন ঘর দেওয়ার জন্য। এ ঘটনা মানবিকতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে তাদের জীবনযাপন স্বাভাবিক করতে বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।