জাহাঙ্গীর আলম, বিশেষ প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের পূর্ব গুজরা গ্রামের একটি পরিবারে মাদকের কারণে ঘটে গেল হৃদয়বিদারক ঘটনা। শনিবার, ২৫ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই গ্রামের চৈতন্য মহাজন বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এক মাদকাসক্ত ছেলে তার জন্মদাতা মা-বাবাকে হত্যা করেছে।
নিহত দম্পতির নাম— স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৪) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ (৫৩)। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, অভিযুক্ত ছেলে রিমন দাশ গুপ্ত (৪৩) দীর্ঘদিন ধরে মাদকের নেশায় জড়িয়ে ছিল। তিনি কয়েক দফা মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হলেও সেরে ওঠেনি বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী তিথি দাশ বলেন, পরিবারটি সকালে একসঙ্গে বাইরে গিয়েছিল। বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ পর চিৎকার শুনে দেখা যায় রিমন তার মাকে ধারালো ছুরিতে আঘাত করছে। স্বপন দাশ তাঁর স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে রিমন তাকে বারবার কোপায়। প্রতিবেশীদের কাছে খবর পৌঁছার আগেই কল্পনা দাশ ঘটনাস্থলেই মারা যান।
প্রতিবেশীরা রক্তাক্ত অবস্থায় স্বপন দাশকে উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী জানান, স্বপন অত্যন্ত গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানোর সময় পথেই মৃত্যু হয়।
জানানো হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরি নিয়ে অত্যন্ত লঘু অবস্থায় রিমনকে পুলিশ অবেলায় গ্রেপ্তার করেছে। আনোয়ারা থানা পুলিশ বলছে, গ্রেফতারকৃত রিমনকে তাঁর বাড়ি থেকেই আটক করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে কল্পনা দাশের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বপন দাশের মরদেহও হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়।
আনোয়ারা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান সংবাদসংস্থাকে নিশ্চিত করেছেন, দুটি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চমেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হচ্ছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা করার প্রস্তুতি চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা বলছেন, পরিবারের মধ্যে টাকা চাওয়া অথবা পারিবারিক কলহের জেরে এই ঘটনা হতে পারে; তবে সঠিক কারণে তদন্ত চলছে। খবরে আরও বলা হয়, রিমনকে আগে বিভিন্ন সময়ে রিহ্যাবে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
মৃত দম্পতির বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা দায়ীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থল এবং পরিবারকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে ময়নাতদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চালানোর সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার সত্যতা ও প্রেক্ষাপট জানার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এবং আশপাশের লোকজনের বয়ান সংগ্রহ করছেন।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে মানবিক ও সামাজিক প্রশ্নও তীব্রভাবে উঠেছে— কিভাবে নেশার জিম্মি একজন সন্তান নিজের আশ্রিত মা-বাবার প্রতিও এত নির্মম হতে পারে এবং একই সঙ্গে সমাজ ও পরিবারের সহায়তা, পুনর্বাসন ব্যবস্থার চিত্রও পর্যালোচনার দাবি করছে।
পুলিশ এই ঘটনার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ও তদন্তের অগ্রগতি পরবর্তী সময়ে জানাবে। স্থানীয়রা দোষীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
আনোয়ারা থানা, চট্টগ্রাম; সংবাদ সংগ্রহ ও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আনোয়ারা পুলিশ ও স্থানীয় হাসপাতাল সূত্র।