গাজীপুরের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে শত শত পোশাক কারখানা। এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার জেরে প্রায় এক মাস ধরে তিতাসের গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উপজেলার নিশ্চিন্তপুর, সফিপুর, মৌচাক এবং গাজীপুর সদর এলাকার শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করে কোনোমতে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও প্রতিদিন গোনতে হচ্ছে কোটি টাকার লোকসান। এতে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নিশ্চিন্তপুরের লিবাস টেক্সটাইল ও নরু গ্রুপের মতো শীর্ষস্থানীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ থেকে ৩০ শতাংশে। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় সুতা উৎপাদন, ডাইং এবং ফিনিশিং সেকশনের অধিকাংশ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি বন্ধ রয়েছে। শ্রমিকদের কর্মমুখর পরিবেশ হারিয়ে কারখানার ভেতরে বিরাজ করছে স্থবিরতা। শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে মালিকপক্ষ সম্প্রতি একসঙ্গে দুপুরের খাবারের আয়োজন করলেও চাকরি হারানোর আতঙ্ক কাটছে না তাদের মন থেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মেশিন অপারেটর বলেন, ‘কারখানায় গ্যাস নেই, কাজও নেই। এভাবে চলতে থাকলে মালিকপক্ষ বেতন দেবে কীভাবে আর আমাদের সংসারই বা চলবে কীভাবে?’
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়েও সুফল মিলছে না, উল্টো ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। কালিয়াকৈরের একটি মাঝারি কারখানার মালিক জানান, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে মাসে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা খরচ হতো, সেখানে বর্তমানে শুধু ডিজেল কিনতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার লিটার জ্বালানি লাগছে। গত তিন মাসে শুধু জ্বালানি বাবদই ৫ কোটির বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে। এই অব্যাহত লোকসান নিয়ে কারখানা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে। কালিয়াকৈরের কারখানাগুলোতে কাপড় ডাইং করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ডাইং ইউনিট বন্ধ থাকায় প্রক্রিয়াজাতকরণের অপেক্ষায় থাকা কয়েক টন ভেজা কাপড় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের শঙ্কা, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেয়ে ক্রয়াদেশ বাতিল করে দেবেন। এর ফলে বড় ধরনের ধস নামবে স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং বেকার হয়ে পড়বেন হাজার হাজার শ্রমিক।
এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গাজীপুর শাখার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, যতটুকু গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। অন্যদিকে গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কালিয়াকৈরের কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া ও দ্রুত এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।