বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন
Title :
মোড়ক উন্মোচন: কালোত্তীর্ণ হবে ‘রাজনীতির সদরে-অন্দরে’ নাটোরের গুরুদাসপুরে ৫ কিমি দীর্ঘ আলোচিত সড়ক পাকাকরণ কাজের উদ্বোধন এখন ইইডির প্রধান প্রকৌশলী হতে বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতার দৌড়ঝাঁপ নারায়ণগঞ্জে গভীর রাতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের সময় হাতেনাতে আটক ২ দুই জঙ্গিসহ জেল পালানো ৬৯০ বন্দি এখনও পলাতক: কারা মহাপরিদর্শক মিয়ানমারের বিবৃতির সাথে একমত নয়, রাষ্ট্রদূতকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে জানাল ঢাকা ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় রিসোর্ট দখল, ছাত্রদল নেতার নামে মামলা প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া করায় পদ হারালেন জামায়াত নেতা ঢাবির ফজলুল হক হলে হামলার প্রতিবাদে ডাকসুর মানববন্ধন সরকারি চাকরি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ: আইনমন্ত্রী

গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এক বিপ্লবীর গল্প

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ Time View
24

মোঃ মাইন উদ্দিন :

ইতিহাসে কেউ কেউ শুধু একটি সময়ের মানুষ নন, তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক। তাঁদের জীবন ছড়িয়ে পড়ে মানুষের অধিকার, মুক্তি ও সংগ্রামের ইতিহাসে। তারা রশিদ মাস্টার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েও যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি ও বঞ্চিত মানুষের মুক্তির স্বপ্নে। শিক্ষকতা, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গণআন্দোলন- জীবনের প্রতিটি পর্বেই তিনি খুঁজেছেন মানুষের মুক্তির পথ।
তাঁর জীবন ছিল একদিকে সংগ্রামের, অন্যদিকে ছিল নির্মাণের। তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করেছেন, তেমনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান গড়ে সমাজ পরিবর্তনের ভিতও শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। মাত্র কয়েক দশকের জীবনেই তিনি রেখে গেছেন এমন এক কর্মময় উত্তরাধিকার, যা তাঁকে স্থানীয় ইতিহাসের গণ্ডি পেরিয়ে গণমানুষের সংগ্রামের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
তারা রশিদ মাস্টার ১৯৪২ সালের ১ নভেম্বর নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার বীর আহমদপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আব্দুল ছোবহান এবং মা আকিমুন্নেছা।
শৈশব থেকেই শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। স্থানীয় সাগরদিঘি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে তিনি ভর্তি হন হাতিরদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মেট্রিক পাস করার পর নরসিংদী কলেজে পড়াশোনা করেন এবং বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে শিক্ষকতাকে জীবনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। কাপাসিয়ার কপালেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন। তবে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের চিন্তার মুক্তি ঘটায়, আর সেই চিন্তার মুক্তিই সমাজ পরিবর্তনের শক্তি তৈরি করে।
তারা রশিদ মাস্টারের জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। স্থানীয় প্রবীনদের মুখে শুনা যায় হলুদ রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা ছিল তাঁর পরিচিত পোশাক। সাধারণ মানুষের ভিড়ে তাঁকে আলাদা করে চেনা যেত তাঁর পোশাকের কারণে যেমন, তেমনি তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণেও।
মানুষের সঙ্গে খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন তিনি। অল্প সময়ের কথোপকথনেই একজন অপরিচিত মানুষকে আপন করে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তাঁর কথায় ছিল দৃঢ়তা, আচরণে ছিল আন্তরিকতা এবং নেতৃত্বে ছিল মানুষের প্রতি আস্থা। আর এই সহজাত নেতৃত্বগুণই তাঁকে ছাত্রজীবন থেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে।
পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। একদিকে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাব, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তি- এই দুই মেরুর মাঝেও তারা রশিদ মাস্টার নিজের স্বতন্ত্র নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন।
নরসিংদী কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়ে তিনি তাঁর নেতৃত্বের সক্ষমতার প্রমাণ দেন। ছাত্রজীবনের সেই নেতৃত্ব পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিয়ে যায় বৃহত্তর গণআন্দোলনের ময়দানে।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকে তিনি সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে ধীরে ধীরে পরিণত করে এলাকার একজন জনপ্রিয় জননেতায়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। দেশের অন্যসব এলাকার মতো মনোহরদীতেও তখন তৈরি হচ্ছিল প্রতিরোধের প্রস্তুতি। এই সংকটময় সময়ে তারা রশিদ মাস্টারও বসে থাকেননি। নিজ এলাকায় ছাত্র, যুবক, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
সাগরদী গ্রামের জমিদার বাড়ির নির্জন আমবাগানে গড়ে তোলেন একটি গেরিলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রাথমিক কলাকৌশল ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তরুণদের সংগঠিত ও প্রস্তুত করার কাজও চলতে থাকে।
একাত্তরের মার্চে মনোহরদী সদরে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনাও তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়ে তিনি স্থানীয় হাট-বাজারে পাকিস্তানি সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করতে থাকেন।
তারা রশিদ মাস্টারের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল কৃষক ও মেহনতি মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
কৃষকদের নিয়ে তিনি ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে কৃষকদের সংগঠিত প্রতিরোধ একপর্যায়ে এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সরকার ইজারা প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
এ আন্দোলন শুধু একটি প্রথা বাতিলের ঘটনা ছিল না এটি ছিল স্থানীয় কৃষকদের অধিকার সচেতন হয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আর এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তারা রশিদ মাস্টারের সঙ্গে সাধারণ কৃষকের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। মানুষ বুঝতে শুরু করে এই নেতা শুধু বক্তৃতা করেন না, মানুষের দাবি নিয়ে মাঠেও থাকেন।
তারা রশিদ মাস্টার উপলব্ধি করেছিলেন, সমাজ পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। মানুষের চিন্তার জগতেও পরিবর্তন আনতে হবে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
এই চিন্তা থেকেই তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে নীলাচলে কলাবিতান, সাগরদী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও খিদিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। গণমানুষের প্রতিবাদ ও অধিকারচেতনার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মনোহরদী উপজেলা শাখার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি।
তাঁর উদ্যোগে এলাকায় মঞ্চস্থ হয়- গরিব কেন মরে, একমুঠো অন্ন চাই, বিষাদসিন্ধু, ভাষা শহীদেরা মরে নাই, ২৯শে ফেব্রুয়ারি ফিরিয়ে দাওসহ বিভিন্ন নাটক। এসব নাট্যচর্চা শুধু বিনোদনের আয়োজন ছিল না, বরং মানুষের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শাণিত করার সাংস্কৃতিক প্রয়াস ছিল।
১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে তারা রশিদ মাস্টার মনোহরদী থেকে কুঁড়েঘর প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তিনি বিপুল ভোট অর্জন করে বিজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যান। নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলেও এই ফলাফল তাঁর ব্যাপক জনভিত্তি ও জনপ্রিয়তারই প্রমাণ বহন করে।
এর আগে পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রকাশ্যে ন্যাপের ব্যানারে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
তারা রশিদ মাস্টারের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে- তাঁর কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষ।
কৃষক যেন ন্যায্য অধিকার পায়, শ্রমিক যেন মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে, দরিদ্র মানুষ যেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির সুযোগ পায়- এই স্বপ্নই তাঁকে বারবার মানুষের কাছে নিয়ে গেছে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদলে আসে না। প্রয়োজন মানুষের চিন্তার পরিবর্তন, অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সংগ্রাম।
এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর শিক্ষকতা যেমন ছিল সমাজ গড়ার প্রয়াস, তেমনি তাঁর রাজনীতি ছিল মানুষের মুক্তির সংগ্রাম এবং তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছিল চেতনা জাগানোর হাতিয়ার।
কিন্তু এই কর্মময় জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৭৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আততায়ীর হাতে তারা রশিদ মাস্টার প্রাণ হারান। একটি প্রাণের অবসান ঘটে, থেমে যায় একজন সংগ্রামী মানুষের পথচলা। কিন্তু মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি ধারণ করেছিলেন, সেটি কি তাঁর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?
ইতিহাস বলে, আদর্শবান মানুষের মৃত্যু অনেক সময় তাঁদের জীবনকে আরও দীর্ঘ করে দেয়। ব্যক্তি হিসেবে তারা রশিদ মাস্টার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, তাঁর চিন্তা এবং মানুষের জন্য তাঁর স্বপ্ন রয়ে গেছে মানুষের স্মৃতিতে।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে তারা রশিদ মাস্টারের জীবনকে ফিরে দেখা মানে শুধু অতীতের একজন বিপ্লবীকে স্মরণ করা নয়, বরং মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈষম্যহীন সমাজের প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে আনা।
একজন শিক্ষক কিভাবে সমাজকর্মী হয়ে ওঠেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী কিভাবে গণমানুষের নেতা হয়ে ওঠেন, আর একজন বিপ্লবী কিভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন- তারা রশিদ মাস্টারের জীবন তার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
তাঁর পোশাক ছিল সাধারণ, জীবন ছিল সাদামাটা, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল বিশাল। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল মানুষ- বিশেষ করে সেই মানুষ, যে শোষিত, বঞ্চিত এবং অধিকারহীন।
তাই তারা রশিদ মাস্টার শুধু একটি নাম নন। তিনি একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি সংগ্রামের স্মারক এবং কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯৭৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেনি। সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার যে আকাঙ্ক্ষা তিনি বুকে ধারণ করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় আজও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
বিপ্লবী তারা রশিদ মাস্টার- গণমানুষের মুক্তির স্বপ্নে যিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও লাল সালাম।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com