বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ধনকুবের ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের বর্ণাঢ্য জীবন এবং তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে একটি নতুন তথ্যচিত্র। অস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনি দীর্ঘ চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন, যা ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। এই প্রামাণ্যচিত্রে মাস্ককে কেবল একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা হিসেবে না দেখে, বরং তার প্রভাব এবং তৈরি করা প্রচারণার আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নটি জোরালোভাবে তোলা হয়েছে। মূলত আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবসা এবং মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি মাস্কের ব্যক্তিজীবনের নানা অজানা ও বিতর্কিত দিক এর মাধ্যমে বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরিচালক গিবনি এই তথ্যচিত্র তৈরির মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, তিনি মূলত মাস্কের কর্মপদ্ধতি ও তার আসল লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে চেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে মাস্ককে নিয়ম ভাঙতে পছন্দ করা এক প্রতিভাবান উদ্ভাবক হিসেবে সাধারণ মানুষ জানলেও, সাম্প্রতিককালে তার বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান ও ডানপন্থি দলগুলোর সঙ্গে সখ্য অনেকের মনেই সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। নির্মাতার মতে, মাস্কের জীবন ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অতীতে আলোচিত কিছু বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের অনেক মিল রয়েছে। এমনকি অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত এনরন কেলেঙ্কারি বা থেরানোসের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ হোমসের মতো চরিত্রগুলোর সঙ্গেও মাস্কের প্রচারণার সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
তথ্যচিত্রটিতে ইলন মাস্ককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ধরনের ভক্তকুল বা ‘কাল্ট’ সংস্কৃতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। টেসলার অনুসারীদের অন্ধ ভক্তিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডানপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠতা কীভাবে বিকশিত হয়েছে, তা এতে দেখানো হয়েছে। সিলিকন ভ্যালিতে মাস্কের শুরুর দিকের সংগ্রাম, স্পেসএক্স ও টেসলার অবিশ্বাস্য উত্থান এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ডানপন্থি নেতার সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ধারাবাহিক মূল্যায়ন রয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্রে। তবে মাস্কের অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত বাস্তবসম্মত হয়নি বলে দাবি করেছেন নির্মাতা, যার মধ্যে টেসলার অটোপাইলট প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং এর ফলে ঘটা দুর্ঘটনাগুলোও স্থান পেয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিতর্ক এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনও এই তথ্যচিত্রের বাইরে থাকে নি। মাস্কের প্রথম স্ত্রী জাস্টিনসহ তার সাবেক প্রেমিকা ও সন্তানের মা অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ার এতে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। জাস্টিন মাস্কের ক্রমবর্ধমান সন্তানের সংখ্যাকে একটি কারখানার উৎপাদন লাইনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, অন্যদিকে সেন্ট ক্লেয়ার সম্পর্কের পর গোপনীয়তা রক্ষার বড় অঙ্কের প্রস্তাব প্রত্যাখান করার কথা জানিয়েছেন। এদিকে, ইলন মাস্ক আগে থেকেই এই তথ্যচিত্রটিকে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং এতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ সরাসরি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে, কেবল মাস্ক একা নন, বরং প্রযুক্তি খাতের এই শীর্ষ ধনকুবেরকে একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ সমাজ কীভাবে করে দিয়েছে, সেই প্রশ্নটিও পরিচালক শেষ পর্যন্ত দর্শকদের সামনে এনেছেন।