নওগাঁ প্রতিনিধিঃ যাদের ঘিরে সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বজনেরা, তারাই আজ না ফেরার দেশে। সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর ১৩ যুবকসহ ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে থমকে গেছে ১২ পরিবারের স্বপ্ন। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন নতুন করে সামনে এসেছে ঋণের বোঝা, সংসার চালানোর অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোয়ালী গ্রামের ময়না বেগমের (৬৫) আর্তনাদ যেন থামছেই না। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সমিতির কাছ থেকে ঋণ করে দুই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ছেলেদের বিদেশ পাঠাতে নেওয়া সেই ঋণের টাকা সুদে-আসলে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখে। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করার...
45
নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
যাদের ঘিরে সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বজনেরা, তারাই আজ না ফেরার দেশে। সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর ১৩ যুবকসহ ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে থমকে গেছে ১২ পরিবারের স্বপ্ন। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন নতুন করে সামনে এসেছে ঋণের বোঝা, সংসার চালানোর অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তা।
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোয়ালী গ্রামের ময়না বেগমের (৬৫) আর্তনাদ যেন থামছেই না। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সমিতির কাছ থেকে ঋণ করে দুই ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। ছেলেদের বিদেশ পাঠাতে নেওয়া সেই ঋণের টাকা সুদে-আসলে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখে। কিন্তু ঋণের টাকা শোধ করার আগেই সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর দুই ছেলে মোহন প্রামাণিক (২২) ও সুমন প্রামাণিক (১৬)।
ময়না বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী অসুস্থতার কারণে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। ছোট ছেলেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। পরিবারের উপার্জনের প্রধান ভরসা ছিলেন মোহন ও সুমন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়না বেগম বলেন, বড় ছাওয়াল মোহন সাত বছর আগে মানুষের কাছে জমি বন্ধক আর সমিতি থেকে চার লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি গেছিল। সুদের ওপর ল্যাওয়া সেই টাকা এখন আট লাখ হছে। দুই বছর আগে মেজ ছাওয়াল সুমনও সৌদিত গেছে। ওরা হামাক স্বপ্ন দেখাছিল, কাজ করে ঋণের টাকা শোধ করবে, পাকা বাড়ি করে দিবে।
তিনি বলেন, ওগের পাঠানো টাকা দিয়ে চার দিন আগেই বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছি। বড় ছেলের স্বপ্ন ছিল বাড়ি করা শেষ হলে দেশে আসবে, বিয়ে করবে। এখন বাড়ি দিয়ে কী হবে, যেখানে হামার বাছাধনরাই নাই।
শুধু ময়না বেগমের পরিবার নয়, একই স্বপ্ন নিয়ে সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন সাইদুর প্রামাণিক ও আনোয়ারা বেগম দম্পতি। তাঁদের একমাত্র ছেলে রুবেল প্রামাণিকও নিহত হয়েছেন ওই অগ্নিকাণ্ডে।
আনোয়ারা বেগম বলেন, “অনেক দোয়া-দরুদের পর রুবেল হইছিল। ভাবছিলাম ছাওয়ালটা বড় হয়ে বুড়া বয়সে হামাগের দেখবে। সেই ছাওয়ালটাই এভাবে চলে গেল। ১৬ দিন হলো মেয়ে বাচ্চা হইছে। সেই বাচ্চাটাও বাপ হারালো। হামাগের এখন কে দেখবে?
তিনি জানান, রুবেলের বাবা মাছ ধরতেন। অসুস্থ হয়ে এখন আর মাছ ধরতে পারেন না। সংসারের অভাব ঘোচাতে ধার-দেনা করে মাত্র তিন মাস আগে রুবেল সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল সেখানে কাজ করে ঋণের টাকা শোধ করবেন, পরিবারকে স্বচ্ছল করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ রেজিস্ট্রিপাড়ার বাসিন্দা মিম বেগমের গল্পও ভিন্ন নয়। তাঁর স্বামী শাহীনুর রহমান সংসারের অভাব ঘোচাতে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ করে পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে যান। ঋণের টাকা শোধ হওয়ার আগেই তিনিও অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন।
মিম বেগম জানান, গ্রামের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলার পার-বোয়ালিয়া এলাকায় বসতভিটার জমি বন্ধক রেখে একটি সমিতি থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। সেই টাকা দিয়েই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। এখন ঋণের টাকা শোধ করতে না পারলে বসতভিটার জমি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
দুই সন্তান ও অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে অসহায় মিম বলেন, এখন হামি অথই পাথারে পড়ে গেছি। হামার সংসার চলবে কিভাবে? দুই ছাওয়ালেক বাঁচামু কিভাবে? আর ঋণের টাকাই বা শোধ করমু ক্যামনে?”
তিনি বলেন, “সুখের আশায় হামার স্বামী বিদেশত গ্যাল। কিন্তু বিদেশত য্যাইয়ে তার জানটাই চলে গেল। দ্যাশত থাকলে রিকশা-ভ্যান চালায়ে হলেও সংসার চলতো। হামার দুই ছাওয়াল তাদের বাপেক প্যাইতো। এখন ওগের হামি মানুষ করমু কিভাবে?
স্বজনেরা জানান, বিদেশে যাওয়ার সময় অনেকেই জমি বন্ধক, সমিতি থেকে ঋণ কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে টাকা জোগাড় করেছিলেন। তাঁদের স্বপ্ন ছিল- বিদেশে কয়েক বছর কাজ করে ঋণ শোধ করবেন, বাড়ি করবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু এক মুহূর্তের আগুনে সেই স্বপ্নগুলোই এখন ছাই।
গত রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর ১৩ যুবকসহ ১৬ বাংলাদেশি প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার গন্ডগোয়ালী গ্রামেই রয়েছেন চারজন। স্বজনেরা এখন প্রিয়জনদের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
সৌদি আরবের অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ১৩ যুবক হলেন- আত্রাই উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাইফুল হোসেনের ছেলে সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজনুর ছেলে মজিদুল (৩৪) ও মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের মৃত বাদলের ছেলে সুমন (৩১) ও একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোয়ালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন প্রামাণিক (২২) ও তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের জান্নারের ছেলে রুবেল প্রামাণিক (৩০), ফজলু প্রামাণিকের ছেলে কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫), বোয়ালা গ্রামের জাহিদুলের ছেলে হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ সদর উপজেলার নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহীনুর রহমান (৩৮)।
প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন এই পরিবারগুলোর সামনে আরও বড় প্রশ্ন- ঋণের টাকা শোধ হবে কীভাবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ চলবে কীভাবে, আর সংসারের হাল ধরবেনই বা কে?
বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বপ্নের বদলে আজ ১৩টি পরিবারে নেমে এসেছে শোক, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘশ্বাস। স্বজনদের চোখে এখন শুধু একটাই অপেক্ষা! প্রিয় মানুষগুলোর মরদেহ যেন শেষবারের মতো ফিরে আসে দেশের মাটিতে।