শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ন
Title :
বান্দরবানে পর্যটকবাহী মোটরসাইকেল খাদে পড়ে নারীসহ নিহত ২ শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ঢাকার অনুরোধ খতিয়ে দেখছে দিল্লি জুলাই সনদের আলোকে আইন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হবে টুথপেস্ট কেনার সময় যেসব বিষয় যাচাই করার পরামর্শ দিল বিএসটিআই মেটা ইন্ডিয়ার প্রধানসহ একাধিক ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে মামলা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ইতিবাচক অবস্থানে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাসীরুদ্দীন-সারজিসসহ এনসিপির ১০ নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ তাপপ্রবাহে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে : বিশ্বব্যাংক দেশের সব জেলা শিক্ষা অফিসারদের জন্য জরুরি নির্দেশনা পাহাড়ে শতভাগ বিদ্যুতায়নে নতুন উদ্যোগ

হালদা ও কর্ণফুলীর পানি থেকে মাছ—সবখানেই মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকি কোথায়

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ Time View
17

দূষণ এখন নদীর পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। তা জলজ খাদ্যচক্রে প্রবেশ করেছে। নদী থেকে মাছে, মাছ থেকে মানুষের খাদ্যতালিকায় পৌঁছে যাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান দুই নদী নিয়ে গত দুই বছরে প্রকাশিত একাধিক গবেষণা বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এবং কর্ণফুলী ও হালদা নদী সরেজমিন ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দাঁড়ালেই দূষণের চিত্র চোখে পড়ে। পানির ওপর ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, বোতলের ঢাকনা, শোলা, ছেঁড়া স্যান্ডেল, মাছ ধরার জালের টুকরা—আরও কত কী। সদরঘাট এলাকায় সেই দৃশ্য আরও প্রকট। নদীর পানি কালচে। কোথাও কোথাও দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। শহরের বিভিন্ন খাল বেয়ে আসা বর্জ্য নদীর বুকে ছোট ছোট স্তূপ তৈরি করেছে।

কিন্তু চোখে যা দেখা যায়, বিপদ তার চেয়েও গভীরে। ভাসমান প্লাস্টিকের বড় অংশ সময়ের সঙ্গে সূর্যের আলো, ঢেউ আর ঘর্ষণে ভেঙে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এই কণাগুলো এতই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। অথচ সেগুলো এখন শুধু কর্ণফুলীর পানিতেই নয়, নদীর তলদেশের পলিতেও জমা হচ্ছে। একই ধরনের কণা পাওয়া গেছে হালদা নদীর পানিতে। সর্বশেষ গবেষণায় মিলেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—হালদার মাছের শরীরেও ঢুকে পড়েছে এই অদৃশ্য প্লাস্টিক।

অর্থাৎ দূষণ এখন নদীর পানিতে সীমাবদ্ধ নেই। তা জলজ খাদ্যচক্রে প্রবেশ করেছে। নদী থেকে মাছে, মাছ থেকে মানুষের খাদ্যতালিকায় পৌঁছে যাওয়ার একটি পথ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান দুই নদী নিয়ে গত দুই বছরে প্রকাশিত একাধিক গবেষণা বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে এবং কর্ণফুলী ও হালদা নদী সরেজমিনে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

আলাদা সময়ে প্রকাশিত এসব গবেষণা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দূষণের একটি ধারাবাহিক চিত্র ফুটে ওঠে। প্রথমে কর্ণফুলীর পানি ও তলদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। পরে হালদার পানিতে একই দূষকের উপস্থিতি মিলেছে। সবশেষে হালদার মাছের পরিপাকতন্ত্র ও পেশিতেও সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্ণফুলী নদীর ২৪টি স্থান থেকে তিনটি ভিন্ন মৌসুমে পানি ও তলদেশের পলির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪ দশমিক ২৪ থেকে ২৬ দশমিক ৬৮টি এবং প্রতি কেজি শুকনা পলিতে ৭৫ দশমিক ৬৩ থেকে ২৭২ দশমিক ৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মূল্যায়নে এটি উল্লেখযোগ্য মাত্রার দূষণ।

মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে পাঁচ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। বড় প্লাস্টিক ভেঙে যেমন এই কণার সৃষ্টি হয়, তেমনি প্রসাধনী, সিনথেটিক কাপড়, শিল্পকারখানা ও প্লাস্টিক উৎপাদন থেকেও সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এ ধরনের কণা। আকারে অতি ক্ষুদ্র হওয়ায় জলজ প্রাণী এগুলো সহজেই খাবার ভেবে গ্রহণ করে।

গবেষকেরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু নদীর ওপর ভাসছে না; তা নদীর ভেতরে, মাছের শরীরে, এমনকি মানুষের খাদ্যচক্রেও প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষকদের পরামর্শ মেনে সরকারের উচিত হবে এই দূষণ রোধে রূপরেখা তৈরি করা।

কর্ণফুলী গভীর সংকটে

ভারতের মিজোরামের লুংলেই পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম কর্ণফুলীর। পাহাড়ি ঝরনা আর ঢলের পানি বয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে রাঙামাটির বরকল উপজেলার টেগারমুখ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে নদীটি। এরপর পাহাড়, জনপদ ও নগর অতিক্রম করে পতেঙ্গায় বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এই নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি। এর তীরে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অসংখ্য শিল্পকারখানা, নৌপথ ও লাখো মানুষের জীবিকা।

কিন্তু নদীর বর্তমান চিত্র সেই গুরুত্বের সঙ্গে মেলে না। সম্প্রতি কর্ণফুলীর মোহনা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর বুকে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, বোতলের ঢাকনা, কর্কশিট, ছেঁড়া স্যান্ডেল, মাছ ধরার জালের টুকরা ও নানা ধরনের কঠিন বর্জ্য। বিশেষ করে শহরের খালগুলোর মুখে ময়লার স্তূপ বেশি। সদরঘাট এলাকায় নদীর পানি কালচে ও ঘোলাটে। কোথাও কোথাও দুর্গন্ধও ছড়াচ্ছে। নগরের বর্জ্য যেন শেষ পর্যন্ত এসে থামছে কর্ণফুলীর বুকেই।

প্রথম দেখায় হালদা নদীকে অনেকটাই স্বাভাবিক মনে হয়। পাহাড়ি ঢলের স্বচ্ছ পানি, দুই তীরের সবুজ আর শান্ত প্রবাহ দেখে বোঝার উপায় নেই, নদীর ভেতরেও জমা হচ্ছে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা।

এই পরিবর্তনের সাক্ষী নৌকার মাঝি আবদুল আলী। বহু বছর ধরে তিনি কর্ণফুলীতে নৌকা চালান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নদীর বিভিন্ন অংশেই এখন ময়লা–আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। বিশেষ করে খালগুলোর মুখে বর্জ্যের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কারণ, শহরের অধিকাংশ বর্জ্য খাল বেয়ে শেষ পর্যন্ত কর্ণফুলীতে এসে পড়ে। শুধু প্লাস্টিক বা পলিথিন নয়, অনেক সময় লেপ–তোশক, এমনকি মরা গবাদিপশুও নদীতে ভেসে আসে।

চোখে দেখা এই দৃশ্যের সঙ্গে মিল পেয়েছেন গবেষকেরাও। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্ণফুলী নদীর ২৪টি স্থান থেকে তিনটি ভিন্ন মৌসুমে পানি ও তলদেশের পলির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪ দশমিক ২৪ থেকে ২৬ দশমিক ৬৮টি এবং প্রতি কেজি শুকনা পলিতে ৭৫ দশমিক ৬৩ থেকে ২৭২ দশমিক ৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গবেষকদের মূল্যায়নে এটি উল্লেখযোগ্য মাত্রার দূষণ। সবচেয়ে বেশি দূষণ মিলেছে নদীর নিম্নপ্রবাহে, যেখানে নগর, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।

মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজেই মাছ, চিংড়ি, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এটি শুধু নিজেই একটি দূষক নয়, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকও বহন করতে পারে। ফলে জলজ প্রাণীর শরীরে ঢোকার পর এর প্রভাব আরও জটিল হয়ে ওঠে।

—অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া,সমন্বয়ক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি

গবেষণাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে। নদীতে পাওয়া প্লাস্টিক কণার বড় অংশ এসেছে এমনসব উপাদান থেকে, যেগুলো মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহার্য—পানির বোতল, খাদ্যের মোড়ক, সিনথেটিক কাপড়, সিগারেটের ফিল্টার, মাছ ধরার জাল এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য। অর্থাৎ কর্ণফুলীর দূষণের উৎস নদীর ভেতরে নয়; নদীর চারপাশে গড়ে ওঠা মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্পকারখানা ও নগরব্যবস্থার মধ্যেই ছড়িয়ে আছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো প্লাস্টিক কণাগুলো শুধু পানিতে ভেসে থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নদীর তলদেশে জমা হয়। পরে জোয়ার-ভাটা, স্রোত বা ড্রেজিংয়ের সময় আবার পানিতে মিশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এই দূষণ ক্ষণস্থায়ী নয়; নদীর পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি একটি সংকটে রূপ নিচ্ছে।

অনন্য প্রজননক্ষেত্রেও পৌঁছে গেছে অদৃশ্য দূষণ

প্রথম দেখায় হালদা নদীকে অনেকটাই স্বাভাবিক মনে হয়। পাহাড়ি ঢলের স্বচ্ছ পানি, দুই তীরের সবুজ আর শান্ত প্রবাহ দেখে বোঝার উপায় নেই, নদীর ভেতরেও জমা হচ্ছে প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা।

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি অরণ্য থেকে নেমে আসা হালদা বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটানির্ভর নদী। এখানে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালবাউশসহ প্রধান কার্পজাতীয় মাছ স্বাভাবিকভাবে ডিম ছাড়ে। প্রতিবছর এই নদী থেকে সংগ্রহ করা ডিম দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে রেণু উৎপাদনের ভিত্তি তৈরি করে।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই অনন্য নদীও মাইক্রোপ্লাস্টিকের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়নি। চলতি বছর প্রকাশিত এক গবেষণায় হালদার আটটি প্রজাতির ৪৮টি মাছ পরীক্ষা করা হয়। ফলাফল উদ্বেগজনক। পরীক্ষিত প্রতিটি মাছের শরীরেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে গড়ে ৬ দশমিক ৫টি এবং মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত পেশিতে গড়ে ৬ দশমিক ১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ দূষণ শুধু মাছের পাকস্থলীতে আটকে নেই, তা মাছের খাদ্যযোগ্য অংশেও পৌঁছে গেছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা ‘হালদা নদীর মাছের মধ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের একটি প্রাকৃতিক কার্প প্রজননক্ষেত্র’ শীর্ষক গবেষণা সম্প্রতি জীববিজ্ঞান সাময়িকী ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, তৃণভোজী মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ মাংসাশী মাছের তুলনায় বেশি। কারণ, পানিতে ভাসমান প্ল্যাংকটন ও ক্ষুদ্র খাদ্যকণা গ্রহণের সময় তারা অজান্তেই প্লাস্টিকও গিলে ফেলছে। গবেষকদের মতে, মাছের আকার বা ওজনের সঙ্গে এই দূষণের সরাসরি সম্পর্ক নেই। ছোট-বড় সব ধরনের মাছই একই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

রোশাঙ্গির আলম দুই দশকের বেশি সময় ধরে হালদার বুকে মাছের ডিম সংগ্রহ করছেন। তাঁর বাড়িও হালদাপাড়ে। এই জেলে প্রথম আলোকে বলেন, একসময় মৌসুম এলেই নদীতে প্রচুর মাছ ডিম ছাড়ত। এখন সেই দৃশ্য আগের মতো নেই। নদীর পানি আগের তুলনায় অনেক বেশি দূষিত। মাছও কমে গেছে। স্থানীয় ভাষায় তিনি বলেন, ‘হালদা ভালা থাইলে আঁরাও ভালা থাইক্যুম। কিন্তু নদীর স্বাস্থ্য দিন দিন হারাপ অর।’

হালদার পানিতে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের অধিকাংশই ছিল আধা মিলিমিটারেরও ছোট। এত ক্ষুদ্র কণাকে প্ল্যাংকটন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য থেকে আলাদা করা জলজ প্রাণীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে সেগুলো খুব সহজেই খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, হালদার মাছে যে ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, তার সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর গবেষণার মিল রয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ফাইবার বা তন্তু আকৃতির প্লাস্টিক।

নদীতে প্লাস্টিক আসে কোথা থেকে, পৌঁছায় কীভাবে?

গবেষকেরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্ম নদীতে নয়। নদী কেবল এর শেষ আশ্রয়। প্রকৃত উৎস ছড়িয়ে আছে নগর, শিল্পাঞ্চল, খাল-নালা, নর্দমা, বন্দর, বাজার এবং মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রায়। একটি প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, সিনথেটিক কাপড়ের তন্তু কিংবা মাছ ধরার জালের সুতা—ব্যবহার শেষে যেগুলো যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, সেগুলোর বড় অংশই শেষ পর্যন্ত নদীতে এসে পৌঁছায়।

চট্টগ্রাম নগরের খাল গিয়ে মিশেছে কর্ণফুলী নদীতে। ফলে নগরের নালা-নর্দমা ও খাল দিয়ে বয়ে আসা বর্জ্যের বড় অংশের শেষ গন্তব্য এই নদী। এর দুই তীরে রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, ইপিজেড, জাহাজ মেরামত কারখানা, টেক্সটাইল, রাসায়নিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রতিদিনের নগরজীবন ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম মিলিয়ে কর্ণফুলীর ওপর তৈরি হয়েছে এক বহুমাত্রিক দূষণের চাপ।

কর্ণফুলী নদী নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় সম্ভাব্য পাঁচটি প্রধান উৎসের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো শিল্পকারখানার বর্জ্য, নগরের প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার পানি, জাহাজ চলাচল এবং মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য মৎস্য সরঞ্জাম। গবেষণায় নদীতে যে ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এসব উৎসের সরাসরি মিল পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পানির বোতল, খাদ্যপ্যাকেজিং, সিনথেটিক বস্ত্র, সিগারেটের ফিল্টার ও গৃহস্থালি প্লাস্টিকজাত পণ্যে ব্যবহৃত উপাদান।

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে ফাইবার বা তন্তু আকৃতির মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় অংশ আসে সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময় বের হওয়া অতি সূক্ষ্ম সুতা, মাছ ধরার জাল, দড়ি এবং বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্য থেকে। অর্থাৎ একটি কাপড় ধোয়া কিংবা পুরোনো একটি জাল নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও শেষ পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

জানতে চাইলে কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি এস এম পেয়ার আলী প্রথম আলোকে বলেন, চোখের সামনে এই নদী বদলে যাচ্ছে। দখলে নদীটা এখন চিড়েচ্যাপটা হয়ে গেছে। দুই পাশে অসংখ্য কারখানা। এসব কারখানা ও শহরের অপরিশোধিত বর্জ্য পড়ছে নদীতে। ফলে দখলমুক্ত করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

হালদার ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। নদীটির দুই তীরে কর্ণফুলীর মতো এত সংখ্যক ভারী শিল্পাঞ্চল নেই। তবে অন্তত ৮টি শাখা খালের মাধ্যমে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে নদীতে। গবেষকেরা বলছেন, দূষণের উৎস শুধু নদীর আশপাশে সীমাবদ্ধ নয়। উজানের জনবসতি, বাজার, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি বর্জ্য, ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শাখা খালের মাধ্যমে আসা দূষণ ধীরে ধীরে হালদায় জমা হচ্ছে। অর্থাৎ পুরো অববাহিকার সম্মিলিত প্রভাব এই নদীর ওপর পড়ছে।

নদীর পানি থেকে মাছের শরীরে, তারপর কোথায়

নদীর পানিতে প্রবেশ করা প্লাস্টিক ধীরে ধীরে জলজ খাদ্যচক্রে ঢুকে পড়ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া প্রথম আলোকে বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজেই মাছ, চিংড়ি, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে। এটি শুধু নিজেই একটি দূষক নয়, ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিকও বহন করতে পারে। ফলে জলজ প্রাণীর শরীরে ঢোকার পর এর প্রভাব আরও জটিল হয়ে ওঠে।

অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, আগে নদীদূষণ বলতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি, ভারী ধাতু, তেল-চর্বি, অ্যামোনিয়া কিংবা শিল্পবর্জ্যের বিষয়গুলোই বেশি আলোচিত হতো। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, এখন সেই তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই দূষকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি খালি চোখে দেখা যায় না, সহজে পরিবেশ থেকে অপসারণ করা যায় না এবং একবার নদীতে ছড়িয়ে পড়লে দীর্ঘ সময় সেখানে থেকে যায়। তাই নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা, শিল্পবর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নগরের খাল-নালায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিকল্প নেই।

চট্টগ্রামের সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের অধ্যাপক ইদ্রিস আলী দীর্ঘদিন ধরে কর্ণফুলী নদীর স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নদীর দূষণ যখন শুধু পানিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন এর প্রভাব মূলত নদীর বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়ে; কিন্তু একই দূষণ যখন মাছের শরীরে প্রবেশ করে, তখন সেটি জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ ও খাদ্যনিরাপত্তা—তিনটি ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তাই বিষয়টিকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; জনস্বাস্থ্যের বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।

গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের মানবস্বাস্থ্যের প্রভাব নিয়ে দেশে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণ, দূষণের উৎস শনাক্ত এবং প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ, একবার নদীতে প্রবেশ করার পর এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা আর সহজে সরিয়ে ফেলা যায় না।

এখন করণীয় কী

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) প্রথম উপাচার্য ও চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, কর্ণফুলী ও হালদায় যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, সেটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর প্রধান উৎস শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। উৎপাদনের সময় নির্গত প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য খাল-নালা হয়ে শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে মিশছে। একবার এই কণাগুলো নদীতে প্রবেশ করলে সেগুলো আর অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব।

মোজাম্মেল হক বলেন, অনেক কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার থাকলেও সেগুলো নিয়মিত চালানো হয় না। আবার যেসব ইটিপি চালু রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধনের জন্য তৈরি। মাইক্রোপ্লাস্টিক আটকে রাখার মতো প্রযুক্তি সেখানে নেই। ফলে অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাগুলো পরিশোধিত পানির সঙ্গেই নদীতে চলে যাচ্ছে।

মোজাম্মেল হক আরও বলেন, সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, প্রশাসনিকও। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও বাড়বে। যেসব শিল্পকারখানা আইন অমান্য করে অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ইটিপিকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে মাইক্রোপ্লাস্টিকও পরিশোধন করা যায়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com