মোঃ মাইন উদ্দিন :
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, পর্যটনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র এবং লক্ষ মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যমতে এই বিশাল জলভূমি আজ নৌ-ডাকাত আতঙ্কে আক্রান্ত। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে যখন সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের মনে ভয়ের ছায়া নেমে আসে, তখন তা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
সাম্প্রতিক সময়ে হাওরে পর্যটকবাহী ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা উদ্বেগজনক। অস্ত্রধারী ডাকাতরা প্রকাশ্যে যাত্রীদের জিম্মি করে লুটপাট চালিয়েছে- এমন ঘটনা প্রমাণ করে, হাওরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে কার্যকর নজরদারি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সন্ধ্যা ৬ টার পর যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার বিবেচনায় যৌক্তিক হতে পারে, তবে এটি মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রশ্ন হলো- ডাকাতদের দমন করতে না পেরে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করাই কি একমাত্র পথ? হাওরের মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিরাপত্তাহীনতার দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের চলাচলের সময় সীমিত করা দীর্ঘমেয়াদী কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
প্রয়োজন হাওর নিরাপত্তার জন্য একটি সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে নিয়মিত নৌ-পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বৃদ্ধি, রাতের টহলের জন্য পর্যাপ্ত নৌযান ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি চালানো এবং দ্রুত সহায়তার জন্য জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। পাশাপাশি ডাকাত চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা।
কিশোরগঞ্জের হাওর শুধু একটি ভ্রমণকেন্দ্র নয়, এটি একটি বৃহৎ জনপদের জীবনরেখা। হাওরে নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত থাকলে পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, স্থানীয় অর্থনীতি সংকুচিত হবে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে নাগরিকদের সন্ধ্যার পর চলাচল বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, বরং যে কোনো সময় নিরাপদ চলাচলের পরিবেশ সৃষ্টি করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রশাসনের বর্তমান সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িক ঝুঁকি কমাবে, কিন্তু এর পাশাপাশি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হাওরাঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। হাওরে মানুষের চলাচল সীমাবদ্ধ করার দিন শেষ হওয়া উচিত; এখন প্রয়োজন ডাকাতদের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত করে সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচলের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা