সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ০৮:২০ অপরাহ্ন
Title :
বিএনপির সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন থানায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯০জন আটক চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরলেন রাষ্ট্রপতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এনসিপিতে বহিষ্কৃত নেতার জায়গায় সাদিয়া ফারজানা পাকিস্তানের মাধ্যমে নতুন ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান: ইরানি গণমাধ্যম পদোন্নতির আশায় পুলিশ সদস্যরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করছে: হাসনাত শফিকুর রহমানের সঙ্গে সিঙ্গাপুর হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ মিটিং শেষে বাইরে গিয়ে গালিগালাজ করেন পাটওয়ারী, এতে আমরা অভ্যস্ত, একদমই ক্ষুব্ধ নই: সিইসি

নাম বদলের রাজনীতি: ইতিহাস মুছে ফেলার ব্যর্থ প্রয়াস

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬
  • ৪৫ Time View
58

 

মোঃ মাইন উদ্দিন :
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোবরিয়া-আব্দুল্লাপুর ইউনিয়নের প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো নামকরণ “আলগীরচর” গ্রামের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। গ্রামের মানুষ মানববন্ধন, প্রতিবাদ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা চলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি গ্রামের নাম কেন পরিবর্তন করতে হবে? একটি গ্রাম তো কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কোনো মতাদর্শের প্রতিনিধি নয়। একটি গ্রামের নাম তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। নাম পরিবর্তন করলেই কি মানুষের স্মৃতি থেকে সেই নাম মুছে যাবে?
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই আমরা দেখি, জাতির গর্ব, জ্ঞানী-গুণী ও অবদানশীল ব্যক্তিদের স্মরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সড়ক, স্থাপনা কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়। এসব নাম সাধারণত দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্য ও সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে নামকরণ ও নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি প্রায়শই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হয়।
এদের দেশে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নাম বদলের এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। এক সরকার বা গোষ্ঠী যে নাম রেখে যায়, পরবর্তী পক্ষ সেটি পরিবর্তন করে নিজেদের পছন্দমতো নাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ফলে নামকরণ আর ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয় থাকে না, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক প্রতীক দখলের একটি কৌশল।
যা শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ নয়, আমাদের জাতীয় মানসিকতার এক গভীর সংকটেরও প্রতিফলন। কারণ, একটি জাতি যখন তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে শুরু করে, তখন সেখানে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রচিন্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা কেন ভুলে যাই, ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়, এটি পুরো জাতির সম্পদ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থনৈতিক ব্যয়। একটি প্রতিষ্ঠানের বা এলাকার নাম পরিবর্তন মানে শুধু সাইনবোর্ড বদল নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রশাসনিক নথিপত্র, সিলমোহর, মানচিত্র, ওয়েবসাইট, শিক্ষা সনদ, পরিচয়পত্র এবং মানুষের দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অভ্যাস। এসব পরিবর্তনে বিপুল অর্থও ব্যয় হয়। উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় এই ব্যয় কতটা যৌক্তিক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন, সেখানে নাম পরিবর্তনের মতো বিতর্কিত ও অপ্রয়োজনীয় ইস্যুতে রাষ্ট্রীয় সময় ও অর্থ ব্যয় নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রবণতা কোনো একটি দল বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতীতের সব সরকারই কমবেশি একই ধরনের চর্চা করেছে। বাদ পড়েনি তদারকি সরকারও। যার ফলে এটি এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নাম মুছে ফেললেই ইতিহাস মুছে যায় না। ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, গবেষণায়, সাহিত্যে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া সত্যের ধারাবাহিকতায়।
বরং বারবার নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের অস্থিরতা ও অদূরদর্শিতাকেই প্রকাশ করি। একটি পরিণত জাতির পরিচয় তার স্থিরতা, ধারাবাহিকতা ও সম্মিলিত মূল্যবোধে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনগণের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
জ্ঞানী-গুণীদের সম্মান জানাতে হলে তাদের নাম মুছে ফেলা নয়, বরং তাদের আদর্শ, কর্ম ও অবদানকে ধারণ করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। ইতিহাসকে সম্মান করা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রচিন্তা গড়ে তোলা।
অতএব, সময় এসেছে নিজেদের কাছে প্রশ্ন করার- আমরা কি সত্যিই উন্নয়ন ও ঐক্যের পথে এগোতে চাই, নাকি নাম পরিবর্তনের অনর্থক বিতর্কেই আটকে থাকতে চাই? একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের জন্য এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com