বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সতর্কবার্তাটি ভয়াবহ। সংস্থাটি বারবার বলেছে, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে পরিণত হতে পারে।
রেকর্ডকৃত সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় এই রক্তক্ষরণজনিত ভাইরাল রোগে ১১ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাদুর্ভাবে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পূর্ব ডিআরসিতে ২ হাজার ২৮৭ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত করা হয়।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এ প্রাদুর্ভাব আরও ব্যাপক হতে পারে। কারণ, এ অঞ্চলে বিরল বুন্দিবুগিও স্ট্রেইনের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে, যার বিরুদ্ধে কোনো অনুমোদিত চিকিৎসা বা টিকা নেই। দ্বিতীয়ত, ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে রোগটি সরকারি শনাক্তকরণের বাইরে থেকেই ছড়িয়ে পড়ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় রোগ নজরদারি ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় ডিআরসির ইবোলা রোগীদের সেবাদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীরা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে শুরু করে ক্ষুব্ধ জনতার হামলাসহ নানা ধরনের বাধার মুখে পড়ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় সংকট—তারা নিয়মিত বেতনও পাচ্ছেন না।
ভাইরাসটি ডিআরসির পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস প্রবল। ফলে সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত রোগীদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল উগান্ডা সীমান্তবর্তী ইতুরি প্রদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত এবং এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। উগান্ডায় ২০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ১৬ জুলাই দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, সর্বশেষ নিশ্চিত রোগীও সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
তুলনামূলকভাবে, ২০১৮ সালের প্রাদুর্ভাবের সময় ডিআরসিতে রোগীর সংখ্যা দুই হাজারে পৌঁছাতে ১০ মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল।
এই রোগের বিস্তার রোধে লড়াইয়ের অগ্রভাগে রয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। তারা সংক্রমণের ঝুঁকি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) ঘাটতি এবং সন্দেহপ্রবণ জনগোষ্ঠীর প্রাণঘাতী হামলার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। এ জনগোষ্ঠীর অনেকেই ভাইরাসটির অস্তিত্বই বিশ্বাস করেন না, ফলে চিকিৎসাও নিতে চান না।
অনেক স্বাস্থ্যকর্মী বকেয়া বেতন নিয়েও অভিযোগ করেছেন। গত সপ্তাহে রুয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালের কয়েক ডজন কর্মী ধর্মঘট ডেকে কাজ বন্ধ করে দেন। হাসপাতালটি ইতুরির বুনিয়া শহরের কাছে অবস্থিত একটি প্রধান ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্র। মে মাসে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা কেন্দ্রটির কিছু অংশে আগুন ধরিয়ে দেন এবং ট্রাকে করে পালিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ধাওয়া করেন।
এ পর্যন্ত সেবাদান করতে গিয়ে ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন এবং প্রায় ৩৫ জন মারা গেছেন।
আল জাজিরার কাছে দুই স্বাস্থ্যকর্মী তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের জীবনসংগ্রামের গল্পই এখানে তুলে ধরা হলো।
২৯ বছর বয়সি পালুকু অড্রে রুয়ামপারার একটি স্থানীয় হাসপাতালের কমিউনিটি এনগেজমেন্ট কর্মকর্তা। তার দায়িত্ব বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে মানুষকে ইবোলা সম্পর্কে সচেতন করা। ফলে প্রতিদিনই তাকে অসংখ্য মানুষের মুখোমুখি হতে হয়, যদিও তাদের অনেকেই এই রোগের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। কখনো কখনো পরিস্থিতি শারীরিক হামলার পর্যায়েও পৌঁছে যায়।
পালুকু বলেন, মে মাসে যখন এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়, তখন থেকেই আমি এই কাজে যুক্ত আছি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমার সহকর্মীদের এবং আমাকে দ্রুত সংগঠিত করা হয়েছিল। আমি নিজেকে বলেছিলাম, আমাকে জরুরি ভিত্তিতে কাজে যোগ দিতে হবে—টাকা উপার্জনের জন্য নয়, বরং সবার আগে মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য।
আমি প্রতিদিন সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠি। প্রস্তুতি নিয়ে বুনিয়ার কিন্ডিয়া এলাকা থেকে কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দিই। আমার বাড়ি রুয়ামপারা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ১০ কিলোমিটারেরও (৬ দশমিক ২ মাইল) বেশি দূরে।
কখনো বাসে যাই, আবার অনেক সময় দীর্ঘ পথ হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। কারণ, মে মাসে কাজ শুরু করার পর থেকে আমরা কোনো বেতন পাইনি। এমনকি আমাদের প্রকৃত বেতন কত হবে, সেটিও আমি নিশ্চিতভাবে জানি না।
পালুকু আরও বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সংশয়। তারা ইবোলা ভাইরাসজনিত রোগের ঝুঁকি বোঝে না। কেউ কেউ তো এই রোগের অস্তিত্বই বিশ্বাস করে না। রোগটিকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বও প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেন, এটি পূর্বপুরুষদের দেওয়া শাস্তি। আবার কেউ দাবি করেন, পৃথিবীর জনসংখ্যা কমিয়ে আনতেই এই রোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
প্রতিদিন পালুকু ও তার সহকর্মীদের বুনিয়ার বিভিন্ন সড়ক এবং দুর্গম এলাকায় হেঁটে যেতে হয়। সেখানে অনেক মানুষ তাদের অবিশ্বাসের চোখে দেখে এবং মনে করে, তারা ইবোলা নিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন, সংক্রমণের লক্ষণ সম্পর্কে জানান এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার গুরুত্ব বোঝান।
কিছু মানুষ তাদের পরামর্শ মেনে নেয়। তবে অধিকাংশই তা প্রত্যাখ্যান করে। অনেক সময় ইবোলা প্রতিরোধে কাজ করা কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথরও ছোড়া হয়। জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে কাউকে ছাড় দেয় না।
আতঙ্কে থাকেন স্বাস্থ্যকর্মীরাও। পালুকু বলেন, আমার সবচেয়ে বড় ভয় হলো একদিন ইবোলায় আক্রান্ত হওয়া অথবা ক্ষুব্ধ জনতার হামলার শিকার হওয়া। একবার আমি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলাম। সেদিন যথারীতি কাজে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন যুবক আমাকে ঘিরে ধরে। তারা অভিযোগ তোলে, আমি নিজের লাভের জন্য রোগটির ভয়াবহতা অতিরঞ্জিত করছি।
সৌভাগ্যক্রমে ওই এলাকায় আমার পরিচিত কয়েকজন ছিলেন। তারা এগিয়ে এসে আমাকে উদ্ধার করেন এবং হামলাকারীদের পাথর ছোড়া থেকে বিরত রাখেন। আমি যেখানেই যাই, সঙ্গে জীবাণুনাশকের একটি বোতল ও একটি মাস্ক রাখি। কখনো কখনো দস্তানাও ব্যবহার করি। আর মানুষের ক্ষোভ কমাতে যতটা সম্ভব সহানুভূতির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। তবে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে দৌড়ে পালানো ছাড়া উপায় থাকে না।
তিনি আরও বলেন, আমি একটি দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছি। আমাদের পরিবারের মধ্যে একমাত্র আমিই চাকরি করি। সংসারের খরচ চালাতে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। পরিবারের সবাই আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তারা সব সময় আমার জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। আমি মনে করি, জীবন মানেই ঝুঁকি আর সুযোগ। কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাবি, আমি যদি আর বেঁচে না থাকি, তাহলে তারা কীভাবে চলবে?
পালুকু আরও বলেন, একটি দিনের কথা আমি কখনো ভুলতে পারি না। প্রাদুর্ভাবের শুরুতে ইবোলায় মারা গেছেন বলে সন্দেহ করা প্রথম কয়েকটি লাশ পরিবহণে আমি সহায়তা করেছিলাম। ওই এলাকার মানুষ তখন ভীষণ ক্ষুব্ধ ছিল। কফিনের ভেতরে সত্যিই কোনো মৃতদেহ আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তারা আমাদের কফিন খুলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিল। আমি ও আমার সহকর্মীরা এতে রাজি হইনি। তখন তারা আমাদের মারধরের হুমকি দেয়। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ।
তবু আমার মনে হয়, এটি অত্যন্ত লজ্জার বিষয় যে আমরা এক লিটার পানিও কিনতে না পেরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কাজ করে যাচ্ছি। এই মহামারী মোকাবিলায় অর্থায়নকারী আন্তর্জাতিক দাতাদের উচিত আমাদের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি আশাবাদী। কারণ অনেক মানুষ আমাকে কথা দিয়েছেন, তারা আমার পরামর্শ মেনে চলবেন এবং আমার বার্তা অন্যদের কাছেও পৌঁছে দেবেন। আমার কাজ মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে—এটি আমাকে গর্বিত করে। আমি বিশ্বাস করি, একদিন আমার দেশ আমার এই অবদানের মূল্যায়ন করবে।
একই কেন্দ্রে কর্মরত ৩৫ বছর বয়সি ঘিসলেইন মানেবা রুয়ামপারা চিকিৎসাকেন্দ্রের একজন মহামারী বিশেষজ্ঞ। তার দায়িত্ব মানুষের বাড়িতে গিয়ে সন্দেহভাজন ইবোলা রোগীদের শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে সহায়তা করা।
তিনি বলেন, আমার পরিবার উদ্বিগ্ন থাকে, তবে তারা সব সময় আমাকে সমর্থন করেছে। আমাদের ছোট পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী আমি। তাই তাদের বেঁচে থাকা অনেকটাই আমার ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু ইবোলা ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েড জ্বরের মতো নয়। এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী, আর এ কারণেই আমি ভয় পাই। কয়েকজন চিকিৎসক ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায়ই মনে হয়, আগামীকাল হয়তো আমারও একই পরিণতি হতে পারে। যদিও আমি কখনোই তা চাই না।
মানেবা বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট হলো বেতন ও প্রণোদনার অভাব। অনেক সময় কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার ভাড়াই জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। এতদিন কাজ করেও আমরা কোনো বেতন পাইনি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
তিনি আরও বলেন, এই মহামারীর সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি হলো ইবোলায় মারা যাওয়া এক সহকর্মী চিকিৎসকের জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়া। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু এই মহামারী তার জীবন কেড়ে নিয়েছে।
তার কথা মনে পড়লে আজও আমার হৃদয় ভেঙে যায়। আবার তার আত্মত্যাগই আমাকে আরও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। এই দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন এবং এতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। আমি আমার জীবনের এমন সময় এই কাজে ব্যয় করেছি, যা পরিবারের সঙ্গে কাটানোর কথা ছিল।
তারপরও আমি মনে করি, এই লড়াইয়ের মাধ্যমে আমি ইতিহাসের একটি অংশ হয়ে আছি। ইবোলার বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমি চাই, বিশ্ব এই রোগকে যথাযথ গুরুত্ব দিক এবং এর মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করুক।
আমাদের কাজের পরিধি অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা হলে পরিস্থিতি অনেক ভালো হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে যেভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী কর্মীদের জন্য যানবাহন ও খাবারের ব্যবস্থা করা হলেও আমাদের কাজ আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।