মোঃ মাইন উদ্দিন :
যে পরিচয় একসময় ছিল অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক, সেই পরিচয়ের আড়ালে যদি মাদক ব্যবসার মতো ভয়ংকর অপরাধের অভিযোগ উঠে, তবে তা শুধু একজন ব্যক্তির পতনের গল্প নয়, এটি সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।
বলছি- সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্ত এলাকায় এক হাজার পিস ইয়াবাসহ ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে দেওয়ার ঘটনা। যেই ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি শুধু মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, বরং একটি মাদকবিরোধী সংগঠনের ব্যানার ব্যবহার করে নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করতেন এবং ভিন্নমত ও প্রতিবাদকারীদের ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে ভয়ভীতি দেখাতেন।
যদিও ঘটনার সত্যতা এবং অভিযুক্তের অপরাধ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, কিন্তু এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। যেমন: কোনো আন্দোলন, বা কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কারোর সামাজিক অবস্থান কখনোই আইনের ঊর্ধ্বে যাওয়ার লাইসেন্স হতে পারে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিটি গণআন্দোলনের পর কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সেই আন্দোলনের অর্জিত সম্মানকে ব্যক্তিগত ক্ষমতা, প্রভাব বা অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয় না, বরং আন্দোলনের প্রকৃত আদর্শও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি মাদকবিরোধী অবস্থানের মুখোশ পরে নিজেই মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন- যদি তদন্তে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে দ্বিচারিতার এক ভয়ংকর উদাহরণ। সমাজে নৈতিক নেতৃত্বের সংকট তখনই প্রকট হয়ে ওঠে, যখন অপরাধীরা ভালো মানুষের মুখোশ পরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে।
তবে এই ঘটনায় আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। জনতার হাতে আটক হওয়ার পর অভিযুক্তকে গণপিটুনি দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক না কেন, বিচার করার একমাত্র বৈধ কর্তৃত্ব রাষ্ট্র ও আদালতের। জনতার বিচার কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না, বরং এটি নতুন অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে।
মাদক বাংলাদেশের জন্য বহুদিনের একটি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং অপরাধীদের পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে সমানভাবে আইনের আওতায় আনার সংস্কৃতি।
আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোন ব্যক্তি কি পরিচয়ে পরিচিত, কোন আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন বা কার সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে তা দেখার নয়, বরং তিনি আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত। কারণ একজন অপরাধীর কোনো আদর্শিক পরিচয় নেই। অপরাধী শুধু অপরাধী। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- অপরাধকে পরিচয়ের চশমায় না দেখে প্রমাণ ও আইনের আলোকে বিচার নিশ্চিত করা।