মোঃ মাইন উদ্দিন :
বাংলার সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসে কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ি এক অনন্য নাম। এই ভূখণ্ড শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি ছিল মানবতা, সহিষ্ণুতা ও আধ্যাত্মিক চর্চার উর্বর ক্ষেত্র। এখানেই জন্ম নিয়েছেন লালন ফকির, গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথের মতো বাউল সাধক। একই মাটিতে বেড়ে উঠেছেন মীর মশাররফ হোসেন, বাঘা যতীনের মতো ব্যক্তিত্ব। আর এই অঞ্চলের শিলাইদহে বসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কালজয়ী সাহিত্যকর্ম।
অতীত ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই ভূখণ্ডের মূল চেতনা ছিল মুক্তচিন্তা, মানবপ্রেম ও সহাবস্থান। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে, সেই চেতনার জায়গায় যদি উগ্রতা স্থান নেয়, তবে কি আমরা আমাদের শেকড়কে অস্বীকার করছি না?
সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় সুফি সাধক শামীম আল জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের খবর আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। যখন ধর্মের নামে সহিংসতা সংঘটিত হয়, তখন তা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না, বরং একটি সমাজের সহনশীলতার ভিত্তিকেই দুর্বল করে।
বাংলাদেশে ইসলামের বিস্তারে সুফিদের ভূমিকা ইতিহাসস্বীকৃত। তাঁদের প্রচারিত দর্শন ছিল অন্তর্দৃষ্টি, ভালোবাসা ও মানবকল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সুফি সাধকেরা ধর্মকে কঠোর বিধিনিষেধের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই এই অঞ্চলে ইসলাম গ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক।
অন্যদিকে, উগ্র মতাদর্শ, বিশেষত কঠোর, অসহিষ্ণু ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়ানো চিন্তাধারা ধর্মকে ব্যবহার করছে বিভাজন ও সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে। এই প্রবণতা শুধু একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই বিপজ্জনক। কারণ এটি ভিন্নমতকে সহ্য করতে শেখায় না, বরং দমন করতে উৎসাহিত করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে, যদি আজকের এই উগ্রতা অতীতে থাকত, তবে কি লালন ফকির বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মুক্তচিন্তার মানুষরা টিকে থাকতে পারতেন? ইতিহাস হয়তো তার জবাব দেয় না, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা আমাদের সেই আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। “মব” বা গণউন্মাদনা নির্ভর সহিংসতা একটি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যখন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের উদার ও সৃজনশীল অংশ। লেখক, শিল্পী, চিন্তাবিদ। অর্থাৎ যারা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় তাঁরাই হয়ে ওঠেন আক্রমণের লক্ষ্য। ফলে একটি ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতির অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
উগ্রবাদ দমন শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইও। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। আর এর জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
সবশেষে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা মানবধর্মের পথে হাঁটব, নাকি উগ্রতার অন্ধকারে হারিয়ে যাব?