নিজস্ব প্রতিবেদক, মোঃ মাইন উদ্দিন :
রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার প্রবীণ কৃষক ইনু মিয়া। প্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত ভাত স্পর্শ করবেন না এমন অটল সিদ্ধান্তে তিনি টানা ১৭ বছরেরও বেশি সময় ভাত না খেয়ে কাটিয়েছেন। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পহেলা বৈশাখে প্রতিমন্ত্রী মোঃ শরীফুল আলম নিজ হাতে তাকে ভাত খাইয়ে তার দীর্ঘ প্রতিজ্ঞার ইতি টানেন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার রামদী ইউনিয়নের পশ্চিম জগৎচর গ্রামে ইনু মিয়ার বাড়িতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে ভাত তুলে দেন। এসময় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর ভাত পেয়ে ইনু মিয়া হাসিমুখে তা গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি কলা, রুটি, বিস্কুটসহ বিভিন্ন শুকনো খাবার খেয়েই দিন কাটিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্র এলাকায় প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হন ইনু মিয়া। এরপর থেকেই ক্ষোভ ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তিনি ভাত না খাওয়ার শপথ নেন। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এমনকি দলীয় নেতাদের বহু অনুরোধেও তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। পারিবারিক অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজনসহ কোনো ক্ষেত্রেই তিনি ভাত স্পর্শ করেননি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত ১২ জানুয়ারি এক স্থানীয় কর্মীসভায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। তখন উপস্থিত নেতাকর্মীদের সামনে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম ইনু মিয়াকে কথা দেন দল ক্ষমতায় এলে তিনি নিজ হাতে তাকে ভাত খাওয়াবেন। সেই প্রতিশ্রুতিই অবশেষে বাস্তবায়ন হলো পহেলা বৈশাখের দিনে।
ভাত খাওয়ানোর পর প্রতিমন্ত্রী বলেন, দলের প্রতি এমন ভালোবাসা ও ত্যাগ বিরল। ইনু মিয়া আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা তার পাশে থাকব। তিনি ইনু মিয়ার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ এবং বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
জানা যায়, ইনু মিয়া বর্তমানে শারীরিকভাবে দুর্বল ও কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা করেন। জীবিকার তাগিদে একসময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও এখন ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল। তিন সন্তানের জনক এই প্রবীণ ব্যক্তির সংসার কষ্টে-সৃষ্টে চলে।
ইনু মিয়া বলেন, দলের জন্য যে কষ্ট করেছি, আজ তার ফল পেলাম। আমার প্রিয় নেতা নিজ হাতে ভাত খাইয়েছেন এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। তিনি আরও জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা এখনো রয়ে গেছে।
তার স্ত্রী জোছনা খাতুন জানান, এতদিন নানা কৌশলে চেষ্টা করেও তাকে ভাত খাওয়ানো সম্ভব হয়নি। তিনি একবার যা ঠিক করেছেন, তা থেকে আর ফিরেননি। আজ এতদিন পর তাকে ভাত খেতে দেখে খুব ভালো লাগছে, বলেন তিনি।
এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সাথে ছিলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এডভোকেট মশিউর রহমান, উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ কিতাব আলী, সাধারণ সম্পাদক এম.এ হান্নান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মোঃ শাহ্ আলম, কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মানবজমিন প্রতিনিধি এডভোকেট মুহাম্মদ শাহ্ আলম (এপিপি কিশোরগঞ্জ জজ কোর্ট), সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ ফারুকুল ইসলাম ফারুক, রফিকুল ইসলাম আলী, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মোঃ কামরুল ইসলাম মুছা, অর্থ বিষয়ক সম্পাদক মোঃ দেলোয়ার হোসেন মান্নান, রামদী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোঃ মজনু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক মোঃ সাফি উদ্দিন, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহসিন রানা, সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাসুদ আহমেদ ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আজহার উদ্দিন লিটনসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
নেতৃবৃন্দরা মনে করেন, ইনু মিয়ার এই দীর্ঘ প্রতিজ্ঞা ও দলপ্রেম রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে থাকবে। তার এই ত্যাগ নতুন প্রজন্মের কর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।