বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৩ অপরাহ্ন

দক্ষিণ বঙ্গের সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলায় লাখো মানুষের ঢল

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১১ Time View
18

নববর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে এবারও উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় অংশ নিতে সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভিড় জমাতে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখো মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে, যা দক্ষিণ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক সমাবেশে পরিণত হয়।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে থাকে শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।

লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি পুরো ক্যাম্পাসে এনে দেয় এক বর্ণিল আবহ। ‘এসো হে বৈশাখ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ, সঙ্গে ছিল ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের সুর। 

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। সকাল ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদি চত্বর প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

বাঘ, পাখি, পেঁচা, মুখোশ এবং গ্রামীণ জীবনের নানা প্রতীক নিয়ে সাজানো শোভাযাত্রা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। 

মেলায় ছিল ৩০ টিরও অধিক স্টল, যা পরিচালনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা। প্রতিটি ডিসিপ্লিন নিজস্ব উদ্যোগে স্টল সাজিয়ে তোলে, যেখানে ফুটে ওঠে দেশীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। এসব স্টলে পাওয়া গেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা রকম খাবার, দেশীয় পোশাক, হাতে তৈরি গহনা, খেলনা এবং হস্তশিল্প।

পিঠাপুলি, জিলাপি, ফুচকা ও চটপটির পাশাপাশি ছিল নকশিকাঁথা, পাটের তৈরি সামগ্রী এবং মাটির তৈরি শোপিস সব মিলিয়ে যেন এক গ্রামীণ মেলার আবহ তৈরি হয়। 

মেলায় বিশেষ আকর্ষণ ছিলো নেপাল থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের স্টল। নেপালি স্টলে ছিলো দেশটির জনপ্রিয় খাবার সেল রুটি, মোমোস, ইয়োমারি, মুস্তাংয়ের আলু, ছোইলা, সাদেকো চাউচাউ ও গিলো চটপটি। পাশাপাশি নেপালের ঐতিহ্যবাহী টুপি, হাতে তৈরি সাংস্কৃতিক সামগ্রী এবং জীবনধারার বিভিন্ন সামগ্রী উপস্থাপন করেছেন।

স্টলগুলোর পাশাপাশি মেলায় শিশুদের জন্যও ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

চরক গুলিসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলনা ও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়, যা ছোটদের জন্য মেলাকে আরও আনন্দময় করে তোলে। শিশুদের কোলাহল, হাসি আর উচ্ছ্বাসে মেলার পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা শিশুদের নিয়ে এসব আয়োজন উপভোগ করেন, যা মেলার সার্বজনীনতাকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। 

সন্ধ্যার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে ছিল লোকসংগীত পরিবেশনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশেষ করে খোলা মঞ্চে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লোকগান, কবিতা আবৃত্তি এবং নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক দপ্তর ও নিরাপত্তা প্রহরীর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ছিল। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল দর্শনার্থীদের সহায়তায় কাজ করে, যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিল নানা অনুভূতির প্রকাশ।

খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী  বলেন, “এত বড় আয়োজন এবং মানুষের অংশগ্রহণ সত্যিই অভিভূত করার মতো। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখী মেলা দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আয়োজন, আমরা প্রতি বছর মেলা উপভোগ করতে পরিবারের সকলকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা হয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম তাঁর বক্তব্যে বলেন, “পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই আয়োজন আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সম্মিলিতভাবে যেভাবে এই উৎসব উদযাপন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। প্রতি বছরের মতো এবছর ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নববর্ষ ঘিরে এ ধরনের বর্ণাঢ্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। এ দিনটিকে ঘিরে খুলনার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে একত্রিত হন, ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও কারুকার্যে সাজানো অনুষ্ঠানমালা সকলের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।”

মেলায় অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শাহিন বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য  আনন্দের দিন, এদিনে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি বিশেষ সুযোগ। বাঙালির চিরাচরিত সংস্কৃতির নানা উপকরন দেখতে পাই।  প্রতি বছর এই দিনগুলোয় ক্যাম্পাসে অন্যরকম সৌন্দর্যের অনুভব করি।”

সন্ধ্যার পর পুরো ক্যাম্পাস আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে, যা মেলার সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তোলে। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষজন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উৎসবের আনন্দ উপভোগ করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © jago barta
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com