জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম নগরীর অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের অভিশাপ জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশাল কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। নগরীকে একটি আধুনিক, টেকসই ও ‘স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রায় ১১ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
বর্তমানে এই প্রকল্পগুলো চসিকের পাইপলাইনে রয়েছে এবং বেশ কয়েকটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। গতকাল (৩০ জুন) নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে চসিকের বাজেট অধিবেশনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এই মেগা প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব ও বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার জলাবদ্ধতা ও সড়ক উন্নয়নে
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য রাখা হয়েছে নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণে। এর মধ্যে ২১টি প্রধান খালসহ অন্যান্য খাল খননের জন্য একটি বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্তৃক বাস্তবায়িত ৩৬টি খালের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও সুচারু পরিচালনার জন্য আরও ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সড়ক নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে বড় বিনিয়োগ করছে চসিক। প্রধান সড়কগুলোর উন্নয়নে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার ‘প্রাথমিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসন ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে রেল ক্রসিংগুলোর ওপর ওভারপাস নির্মাণে ১ হাজার কোটি টাকা এবং দেওয়ানহাট ব্রিজ নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
সিসিটিভি নজরদারি ও স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা
চট্টগ্রামকে একটি নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসিটিভি নজরদারি এবং সোলার ও নন-সোলার স্মার্ট লাইটিং স্থাপনের জন্য ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন আনতে ৪৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সবুজায়ন, বর্জ্য ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন
নগরীর পরিবেশ রক্ষা ও নাগরিক বিনোদন সুবিধা বাড়াতে উন্মুক্ত স্থানসমূহের আধুনিকায়ন ও সবুজায়নের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ আধুনিক রূপ দিতে কোরিয়ান সরকারের অর্থায়নে একটি অত্যাধুনিক ল্যান্ডফিল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই খাতের কার্যক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক যানবাহন ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহে আরও ২৯৮ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রকল্প রয়েছে।
এছাড়া বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘কিচেন মার্কেট কাম বাণিজ্যিক ভবন’ এবং নগরবাসীকে এক ছাদের নিচে আধুনিক সেবা দিতে ২০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ‘নগর ভবন’ নির্মাণের বিষয়টিও চসিকের পরিকল্পনায় জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ১২টি মেগা প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। ফলে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক মানের বাসযোগ্য ও স্মার্ট নগরী হিসেবে রূপান্তরের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাবে।