চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব: চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবার
Reporter Name
Update Time :
শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
১৯
Time View
চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব: চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হচ্ছে নিম্নবিত্ত পরিবার
চট্টগ্রাম নগরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। এই স্বাস্থ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারগুলো। একদিকে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা খরচ, অন্যদিকে কর্মহীনতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক দরিদ্র পরিবার এখন চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কেউ হচ্ছেন ঋণগ্রস্ত, আবার কেউ বিক্রি করছেন সংসারের শেষ সম্বল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের করিডোরে এখন কেবলই অসহায় পিতা-মাতার দীর্ঘশ্বাস। হাসপাতালে পাঁচ দিন ধরে ভর্তি রয়েছে রিকশাচালক নুরুল আলমের তিন বছর বয়সী সন্তান। সন্তানের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ধারদেনা করে এখন আমি নিঃস্ব। রোজগারও বন্ধ। সন্তানের...
28
চট্টগ্রাম নগরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। এই স্বাস্থ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী পরিবারগুলো। একদিকে আক্রান্ত সন্তানের চিকিৎসা খরচ, অন্যদিকে কর্মহীনতা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক দরিদ্র পরিবার এখন চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কেউ হচ্ছেন ঋণগ্রস্ত, আবার কেউ বিক্রি করছেন সংসারের শেষ সম্বল।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের করিডোরে এখন কেবলই অসহায় পিতা-মাতার দীর্ঘশ্বাস। হাসপাতালে পাঁচ দিন ধরে ভর্তি রয়েছে রিকশাচালক নুরুল আলমের তিন বছর বয়সী সন্তান। সন্তানের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ধারদেনা করে এখন আমি নিঃস্ব। রোজগারও বন্ধ। সন্তানের এই অসুখে নিজেকে বড় অসহায় লাগছে।”
একই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ তসলিমউদ্দিন। দীর্ঘ ১৭ দিন ধরে সন্তানের চিকিৎসা চালাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সংসারের একমাত্র সম্বল গরুটিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। এখন চিকিৎসার খরচ আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা এই বাবা।
এদিকে তৈরি পোশাক শ্রমিক রাকিবের পরিবারে চলছে আরও বড় বিপর্যয়। তার দুই সন্তানই একসঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসার পেছনে এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় করেও সন্তানদের পুরোপুরি সুস্থতা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি। প্রতিদিনের ওষুধের খরচ আর অনিশ্চয়তা তাকে ঠেলে দিয়েছে গভীর সংকটে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, জীবনযাত্রার নিম্নমান এবং অসচেতনতাই এই রোগ ছড়ানোর প্রধান কারণ। চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া জানান, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে দরিদ্র এলাকার শিশুদের মধ্যে হামের বিস্তার দ্রুত ঘটছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সংকট মোকাবিলায় কেবল চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছেন। চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, “এ ধরনের প্রাদুর্ভাব রুখতে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি বা বেসরকারি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।”
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১৪৩ জন রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৮৫৭ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ২৮৬ জন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ জন এবং হাম নিশ্চিত হওয়ার পর ৩ জনসহ মোট ১৪টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব নগরের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।